img

জাতীয় পুরস্কার গ্রহণের পর প্রথম সাক্ষাৎকারে শিক্ষিকা বিদিশা মজুমদার

৬৪ তম শিক্ষক দিবসে জাতীয় পুরস্কারের জন্য রাজ্য থেকে নির্বাচিত হয়েছেন বিদিশা মজুমদার, দিল্লি বিজ্ঞান ভবনে দেশের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সেই সম্মান গ্রহণ করার পর প্রথম সাক্ষাৎকার। দ্যা ওয়েভ অব ত্রিপুরার মুখোমুখি হয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের খোলামেলা উত্তর দিয়েছেন তিনি। 
 . শিক্ষকতার জন্য জাতীয় পুরস্কারহাতে নিয়ে কী অনুভূতি হয়েছে
উ: আজ আমার শিক্ষক জীবনের সবচেয়ে গর্বের দিন।দীর্ঘদিন ধরে আমি শ্রেণিকক্ষে বিজ্ঞানকে একটি বিষয় হিসেবে নয় বরং জীবনের সঙ্গে জড়িত এক আশ্চর্য জগৎ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। ছাত্র-ছাত্রীদের চোখে কৌতূহল বিস্ময় আর আনন্দ জাগানোই ছিল আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কিন্তু আজ রাষ্ট্রপতির হাত থেকে জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করা এ যেন আমার সেই স্বপ্নকে এক অসাধারণ স্বীকৃতি দিল। আমি মনে করি এই পুরস্কার শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এটি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের, আমার পরিবারের সকল সদস্যের,আমার সহকর্মীদের। তাদের ভালোবাসা বিশ্বাস আর সহযোগিতা ছাড়া আমি এই পথ অতিক্রম করতে পারতাম না। এই সম্মান আমাকে আরো বড় দায়িত্ব শিখিয়েছে। আমি চাই বিজ্ঞানের শক্তি আর শিক্ষার আলো দেশের প্রতিটি কোণে পৌঁছে যাক। এই পুরস্কার আমার কাছে কেবল আনন্দ নয় বরং ভবিষ্যতে আরো নিবেদিত ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার।
.শিক্ষক দিবসে জাতীয় পুরস্কার এবছর রাজ্য থেকে আপনি, খবর প্রথম কীভাবে পেয়েছিলেন
 উ: শিক্ষক দিবসের এই বিশেষ ঘোষণার সাক্ষী ছিল আমাদের ন্যাশনাল লেভেল সিলেকশনের যে গ্রুপটি করা হয়েছিল সেই গ্রুপের সমস্ত পার্টিসিপেন্সরা এবং গ্রুপ এডমিনরা। আমি প্রথম আমাদের জয়েন্ট ডিরেক্টর স্যার শ্রী রাকেশ দেববর্মা স্যারের পোস্ট থেকে জানতে পারি। তিনি প্রথম গ্রুপটাতে পোস্টটি দেন যে আজকে রেজাল্ট আউট হয়েছে।
৩. এই খবর পাওয়ার পর প্রথম কাকে জানিয়েছেন
উ: এই খবর পাওয়ার পর আমি সেই পাঠানো পিডিএফটা খুলতেই পারছিলাম না ভয়ে এবং টেনশনে। কিন্তু তারপর যখন দেখলাম আমার স্কুলের নাম হরিয়ানন্দ ইংলিশ মিডিয়ামের নাম আছে ত্রিপুরার সিলেকশন লিস্টে তখন আমি আনন্দে উৎসাহিত হয়ে প্রথম আমার ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডাম ঐন্দ্রিলা কর্মকার ম্যাডামকে জানালাম। 
৪.কেমন ছিল এই পুরস্কার অর্জনের যাত্রাপথ
উ: ২০১৮ সালে আমি যখন হরিয়ানন্দ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যোগ দিই, তখন স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ জন। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই আমার কাছে ছিল চ্যালেঞ্জের। কিন্তু আমি মনে করেছিলাম, যদি আন্তরিকভাবে পড়ানো যায়, তবে ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিশ্বাস ও আগ্রহ তৈরি হবে।
আমি রসায়নকে শুধু বইয়ের বিষয় হিসেবে নয়, জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে শেখাতে শুরু করি। ক্লাসে ছোট ছোট এক্সপেরিমেন্ট, প্রজেক্টভিত্তিক লার্নিং, এবং ছাত্রছাত্রীদের কৌতূহলকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে তাদের শেখার মানসিকতা বদলাতে থাকি। ধীরে ধীরে শুধু স্কুলেই নয়, আশেপাশের এলাকাতেও আমাদের কাজের সুনাম ছড়াতে থাকে।
আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে দেখি, সেই ৮০ জন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৫০ জনে। প্রতিটি ক্লাসে শিক্ষার পরিবেশ বদলে গেছে। সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হলো—প্রতিবছর আমাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ন্যাশনাল লেভেলে সিলেকশন পাচ্ছে, যা একসময় শুধু স্বপ্ন ছিল।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে অনেক চ্যালেঞ্জ এসেছে—শিক্ষার মান ধরে রাখা, প্রতিটি ছাত্রকে সমান গুরুত্ব দেওয়া, নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতির ব্যবহার করা—কিন্তু প্রতিটি চ্যালেঞ্জই আমাকে আরও শক্ত করেছে।
অবশেষে যখন শুনলাম আমি ২০২৫ সালের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর টিচার্স (President’s Award) পাচ্ছি, মনে হলো এ শুধু আমার ব্যক্তিগত সম্মান নয়। এটা আমাদের স্কুলের, আমাদের ছাত্রছাত্রীদের, আমাদের সহকর্মীদের এবং পরিবারের। কারণ তাদের বিশ্বাস, সহযোগিতা আর ভালোবাসা ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না।
রাষ্ট্রপতির হাত থেকে এই সম্মান গ্রহণ করার মুহূর্তে আমার চোখে ভেসে উঠেছিল সেই ২০১৮ সালের প্রথম দিন, যখন ৮০ জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে আমি এই যাত্রা শুরু করেছিলাম। আজ ১১৫০ জন ছাত্রছাত্রীর স্বপ্ন, কৃতিত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এ পুরস্কার আমাকে শিখিয়েছে—একজন শিক্ষকের নিবেদন শুধু একটি স্কুল নয়, একটি প্রজন্মকে বদলে দিতে পারে।
. এবছর সারাদেশের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার আপনার হাতে, কোন কোন বিষয়টি আপনাকে এই সাফল্যের জন্য সহযোগিতা করেছে বলে মনে করছেন
উ: এই সম্মান আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে এই পুরস্কার পাওয়া আমার কাছে যেমন আনন্দের, তেমনই দায়িত্বেরও। আমি মনে করি, এ শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়—এটি আমার স্কুল, আমার ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী এবং পরিবারের সবার সম্মিলিত সাফল্য। এই পুরস্কার আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছে, যাতে ভবিষ্যতেও শিক্ষা ও বিজ্ঞানকে আরও সহজ, আকর্ষণীয় এবং বাস্তবমুখী করে ছাত্রছাত্রীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারি।
৬. মাত্র ১০বছরের শিক্ষকতা জীবনে আপনি আপনার হাত ধরে ছাত্রদের ঝুলিতে বেশ কয়েকটি পুরস্কার রয়েছে এরমধ্যে কোনটা বেশী প্রিয়
উ: ডিস্ট্রিক্ট লেভেল প্রতিযোগিতা ও প্রোগ্রামে নিয়মিত সাফল্য।
স্টেট লেভেল ইভেন্ট ও অলিম্পিয়াডে ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও পুরস্কার।
ন্যাশনাল লেভেল প্রোগ্রাম-এ নির্বাচিত হয়ে ছাত্রছাত্রীদের কৃতিত্ব, যা আমাদের স্কুলের জন্য এক বিশাল গর্ব।
আমি সবসময় চেয়েছি ছাত্রছাত্রীদের শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বরং বাস্তবমুখী শিক্ষা দিতে। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই আমাকে ২০২৫ সালের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর টিচার্স (President’s Award) এনে দিয়েছে।২০১৮ সাল থেকে আমি চেষ্টা করছি আমার ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানকে বইয়ের বাইরে নিয়ে যেতে। শুধু পাঠ্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাদেরকে বিভিন্ন বিজ্ঞান উৎসব, প্রদর্শনী ও জাতীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করিয়েছি।
আমার ছাত্রছাত্রীরা যেসব বড় বড় মঞ্চে নিজেদের কৃতিত্ব দেখিয়েছে এবং পুরস্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
INSPIRE MANAK Awards, 
National Children’s Science Congress (NCSC), 
বাল বৈজ্ঞানিক প্রদর্শনী (Bal Vaigyanik Pradarshani), 
Dienes Sustainability Program, 
ISRO Yuvika Young Scientist Program, 
CSIR – Jigyasa Program, 
One Day as a Scientist initiative, 
কিশোরী উৎকর্ষ মঞ্চ, 
National Science Festival, 
India International Science Festival (IISF), 
Synergy 1.0, 2.0, 3.0,
বিজ্ঞানসম্মত পুজো প্রোগ্রাম, 
Science Drama competitions, 
এইসব প্ল্যাটফর্মে আমার ছাত্রছাত্রীরা জেলা (District), রাজ্য (State) এবং জাতীয় (National) স্তরে পুরস্কৃত হয়েছে। তাদের এই ধারাবাহিক সাফল্যই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং এটাই আমার ২০২৫ সালের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড ফর টিচার্স (President’s Award) পাওয়ার অন্যতম বড় কারণ। সত্যি বলতে, আমার শিক্ষক জীবনের এই অল্প সময়ে এত বড় সম্মান পাওয়া আমার কাছে অবিশ্বাস্য গৌরবের বিষয়। আমি ২০১৮ সাল থেকে নানা উদ্যোগ নিয়েছি ছাত্রছাত্রীদের জন্য, কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো—আমার চারজন ছাত্রছাত্রীকে ISRO YUVIKA Young Scientist Program-এ গাইড করা।এই প্রোগ্রামে নির্বাচিত হওয়া অত্যন্ত কঠিন, কারণ সারা ভারতবর্ষ থেকে মাত্র ৩৫০ জন ছাত্রছাত্রী সিলেক্টেড হয়। আমার স্কুল থেকে গত বছর এবং তার আগের বছর—দুই বছরেই চারজন নির্বাচিত হয়েছে। তারা ১৪ দিনের জন্য NRSC Hyderabad Remote Sensing Satellite Centre-এ রেসিডেন্সিয়াল প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। সেখানে তারা হাতে-কলমে শিখেছে স্যাটেলাইট ও স্পেস টেকনোলজি সম্পর্কিত নানা বিষয়। এমনকি তারা Skyroot Aerospace-এর মতো একটি স্টার্টআপ কোম্পানিতেও ভিজিট করেছে, যারা বেসরকারি উদ্যোগে রকেট ও স্পেস মডিউল তৈরি করছে। আমার ছাত্রছাত্রীরা সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসা—আমার জন্য বিশাল আনন্দের ও গর্বের। আমি মনে করি, YUVIKA Program-এ প্রতিটি স্কুল থেকে অন্তত একজন ছাত্রছাত্রীকে ফর্ম ফিল-আপ করে অংশগ্রহণের চেষ্টা করা উচিত। এটা পুরোপুরি সেন্ট্রালাইজড সিলেকশন, তাই সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক। তবে আমার প্রেরণার অন্যতম উৎস হলো INSPIRE MANAK Award, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা তাদের উদ্ভাবনী ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছে এবং বিভিন্ন স্তরে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। INSPIRE-এর মাধ্যমে তাদের চিন্তাভাবনা ও সৃজনশীলতাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পারা আমার শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় সাফল্যের একটি।
৭.এই সাফল্য স্বীকৃতি ভবিষ্যতে শিক্ষকতার ক্ষেত্রে কতটা ফলপ্রসূ হবে? 
উ: আমার কাছে এই পুরস্কার শুধু একটি ব্যক্তিগত সম্মান নয়—এটা আমার শিক্ষকতার আদর্শ ও দায়িত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার এবং ন্যাশনাল টিচার্স অ্যাওয়ার্ড আমাকে শিখিয়েছে যে, একজন শিক্ষকের প্রতিটি প্রচেষ্টা, যত ছোটই হোক না কেন, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে।
এই সম্মান আমাকে তিনটি দিক থেকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিচ্ছে—
1. ছাত্রছাত্রীদের আরও বড় প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়া
আমি চাই আগামী দিনে আরও বেশি ছাত্রছাত্রী ISRO YUVIKA, INSPIRE, NCSC, IISF ইত্যাদি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করুক। তাদের যেন শুধু পরীক্ষার বই নয়, বাস্তব জীবনের বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতাও হয়।
2. গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিজ্ঞান শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া
আমি চাই আমার অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে গ্রামের স্কুলগুলোকেও যুক্ত করতে, যাতে সেখানকার ছাত্রছাত্রীরাও জাতীয় স্তরে সুযোগ পায়। প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রছাত্রীদের জন্য সায়েন্স এক্সিবিশন, ইনোভেশন ক্যাম্প, ওয়ার্কশপ আয়োজন করা আমার ভবিষ্যতের লক্ষ্য।
3. শিক্ষক সমাজকে অনুপ্রাণিত করা
আমি বিশ্বাস করি একজন শিক্ষক একা কিছু করতে পারেন না। তাই আমি চাই অন্যান্য সহকর্মীদেরও এই ধরণের জাতীয় প্রোগ্রামে গাইড করার অভিজ্ঞতা দিই, যাতে আরও অনেক শিক্ষক ও স্কুল উপকৃত হয়।
আমার কাছে এই পুরস্কার কোনো সমাপ্তি নয়, বরং একটি নতুন যাত্রার সূচনা। 
৮.এই বিশেষ দিনে আপনার কোন শিক্ষকের কথা মনে পড়ছে?  
উ:“হ্যাঁ, এই বিশেষ দিনে আমি সবার আগে আমার দাদু ও দিদার কথা স্মরণ করছি। আমার দাদু লেট ক্ষেত্রমোহন মজুমদার এবং দিদা লেট সিঁদুরানী মজুমদার দু’জনেই ছিলেন শিক্ষার পথপ্রদর্শক। তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জুলাইবাড়ি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যা আজও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
আমার দাদু-দিদা ছিলেন আমাদের এলাকার ‘Torchbearers of Education’। তাঁদের স্বপ্ন ছিল—শিক্ষা যেন প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে যায়। তাঁদের সেই স্বপ্নকেই আজ আমি আমার কাজের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে চলেছি।
আজও তাঁদের নামে জুলাইবাড়ি স্কুলে একটি বিশেষ স্কলারশিপ দেওয়া হয়, যাতে ছাত্রছাত্রীরা আরও বেশি মোটিভেটেড হয়ে পরীক্ষা দেয় এবং ভালো নম্বর নিয়ে উত্তীর্ণ হয়। আমি মনে করি, আজ আমি যে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছি, সেটা তাঁদের সেই শিক্ষার আলোয় তৈরি ভিত্তিরই ফল।”
৯. বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ছাত্ররা সিলেবাসমুখী, তাতে তাদের শিক্ষার ব্যাপ্তি কি কমছে?  
উ: বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা কেবলমাত্র সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা করছে। শুধু পরীক্ষায় নম্বর তোলাই যেন একমাত্র লক্ষ্য। অনেক সময় পিতা-মাতারাও চান তাঁদের সন্তান প্রথম বা দ্বিতীয় হোক—এর বাইরে যেন আর কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য এটা নয়। NEP 2020 (National Education Policy 2020) স্পষ্ট করে বলেছে, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো ছাত্রছাত্রীদের সার্বিক উন্নয়ন। শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় আবদ্ধ থেকে কোনও ছাত্রের সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন হয় না।
তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন—
Critical Thinking (সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি) বিকাশ করা।
Experiment-based Learning – বিশেষ করে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হাতেকলমে শেখানো।
Project-based Learning – বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার মাধ্যমে শিক্ষা।
Hands-on Activities – চারপাশ থেকে শেখা।
Peer Activities – সহপাঠীদের সঙ্গে একত্রে কাজ করে শেখা।
Skill Development – ভবিষ্যতের চাকরি ও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা।
Vocational Education – পেশাভিত্তিক শিক্ষা, যাতে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা জীবন দক্ষতাও অর্জন করতে পারে।
এর পাশাপাশি, ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন কম্পিটিটিভ এক্সাম-এ অংশগ্রহণ করানো জরুরি। কারণ এগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায়, আমাদের রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা সর্বভারতীয় স্তরে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। এটা শুধু আত্মবিশ্বাস বাড়ায় না, বরং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও প্রসারিত করে।
সুতরাং, একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময় চেষ্টা করি যাতে ছাত্রছাত্রীরা শুধু ‘নম্বর’ না খোঁজে, বরং শেখার আনন্দ, সৃজনশীলতা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য জ্ঞান অর্জন করে। শিক্ষার সত্যিকারের সার্থকতা সেখানেই।
১০.নম্বরের প্রতিযোগিতায় প্রকৃত শিক্ষা কি ব্যাহত হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?  
উ: মুখস্থবিদ্যার সীমাবদ্ধতা: পরীক্ষায় বেশি নাম্বার আনার জন্য শিশুরা শুধু মুখস্থ করছে, কিন্তু বিষয়বস্তু বোঝার ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না।
2. সার্বিক শিক্ষার ঘাটতি: শিক্ষার আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিশুদের চরিত্র গঠন, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা আর সমালোচনামূলক চিন্তা (critical thinking) তৈরি করা।
3. ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সমস্যা: শুধু নাম্বার-ভিত্তিক শিক্ষা ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে টিকতে সাহায্য করে না। বরং নতুন আইডিয়া, উদ্যোক্তা মানসিকতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সৃজনশীলতা প্রয়োজন।
4. সমাধান:শিশুদের ছোটবেলা থেকে কৌতূহল জাগানো ও প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
শুধু পরীক্ষার খাতিরে পড়ানো নয়, বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়ে শেখানো দরকার।
প্রজেক্ট, গবেষণা, দলীয় কাজ ও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে।
স্কুলগুলোকে মার্কস-নির্ভর শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা-নির্ভর শিক্ষায় জোর দিতে হবে। শিক্ষা শুধু মার্কস বা নাম্বারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটা হওয়া উচিত এমন এক প্রক্রিয়া যা শিশুদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এবং সমাজে অবদান রাখার যোগ্য করে তোলে।

১১. সবশেষে শিশুকে প্রকৃত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কী প্রয়োজন, যা এখনো গড়ে উঠেনি বলে মনে করেন
 উ: শিশুকে বাস্তব জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে যা প্রয়োজন
1. শিক্ষার আধুনিকীকরণ, মুখস্থবিদ্যা নয়, বরং বোঝার উপর জোর দিতে হবে।
সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা (critical thinking) ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
প্রজেক্ট-বেইজড লার্নিং, হাতে-কলমে কাজ এবং গবেষণামূলক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
2. ডিজিটাল ও টেকনোলজিক্যাল দক্ষতা
AI, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, কোডিং ইত্যাদির প্রাথমিক শিক্ষা দিতে হবে।
বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে টেকনোলজিকে কাজে লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
3. নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা
শুধু জ্ঞান নয়, সৎ, দায়বদ্ধ ও সহমর্মী মানুষ হিসেবে বড় হওয়া দরকার। দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষার অংশ হতে হবে।
4. উদ্যোক্তা মানসিকতা (Entrepreneurship)
শিশুদের শুধু চাকরি প্রার্থী নয়, চাকরি প্রদানকারী হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
স্কুল থেকেই ছোট স্টার্টআপ আইডিয়া, বিজনেস প্ল্যান, ইনোভেশন চ্যালেঞ্জের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
 শিশুদের গ্লোবাল ভিশন আর লোকাল রুটস দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। তারা যেন নিজেদের প্রতিভা নিয়ে বিদেশে না গিয়ে এখানেই ভারতের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। এভাবেই শিশুই হবে দেশের পথদর্শক ও টর্চবিয়ারার—যে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে না, বরং ভারতবর্ষকে আগামী দিনের বিশ্বনেতা করে তুলবে।