
কার্তিক বণিক
গত শনিবার, ১০ জানুয়ারি মুক্তধারা প্রেক্ষাগৃহে নন্দনতৃষা নাট্যদল সম্মিলিত নাট্য প্রয়াসের উদ্যোগে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ নাটকটি মঞ্চস্থ করে। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা সমীর দত্ত।
‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ নাটকটির নাম শুনেই দর্শকের মনে এক ধরনের দার্শনিক ও গভীর প্রত্যাশা জন্ম নেয়। মনে হয়, হয়তো এটি জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর দ্বন্দ্ব, মানুষের লড়াই, অথবা কোনো মহান আদর্শের গল্প বলবে। কিন্তু নাটকটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এই নাটকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর বক্তব্যের অস্পষ্টতা। নাটকটি ঠিক কী বলতে চায়—মানুষের সংগ্রাম, নৈতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক সংকট না কি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি—তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন দৃশ্যে নানা ইঙ্গিত থাকলেও সেগুলো একটি সুসংহত দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপ পায় না। ফলে দর্শক বিভ্রান্ত হতে পারে এবং তাতে নাটকের মূল সুর ধরতে সমস্যা হতে পারে।
প্রধান চরিত্র অনিলকে কেন্দ্র করেই নাটকটি আবর্তিত হয়। তিনি পত্রিকায় লেখা-লেখি করেন, তাতে কিছু অর্থ পেয়ে থাকেন। কিছুটা আদর্শবান মানুষ যিনি মাটির সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হতে সবাইকে প্রেরণা দেন। কিন্তু এই চরিত্রটি নির্মাণে নির্দেশক যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে হয়ছে। তার মানসিক দ্বন্দ্ব, উদ্দেশ্য, সিদ্ধান্ত এবং পরিবর্তনের কোনো সুস্পষ্ট রেখা নেই। কখনো সে দৃঢ়, কখনো আবার সম্পূর্ণ বিপরীত—কিন্তু এই পরিবর্তনের কোনো নাটকীয় বা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নেই। ফলে অনিল একটি জীবন্ত চরিত্র না হয়ে কেবল কিছু ভারি ভারি সংলাপের বাহক হয়ে ওঠে।
নাটকের গতি বা প্রবাহও একটি বড় সমস্যা। বহু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ, সংলাপ ভারী ও পুনরাবৃত্তিমূলক। এতে নাটকের ছন্দ ভেঙে যায় এবং দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নাটকে তৈরি হলেও নাটকের দীর্ঘ সময়ই শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে নাটকটি সম্পাদনা করলে টান টান উপস্থাপনা সম্ভব হতে পারে। তবে নাটকটির কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। মঞ্চসজ্জা ও আলোক পরিকল্পনায় কিছু দৃশ্যে নান্দনিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। কয়েকটি সংলাপে দার্শনিক ভাবনার আভাস মিললেও সেগুলো যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। সব মিলিয়ে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’ নাটকটি একটি সম্ভাবনাময় ভাবনাকে ধারণ করলেও তার সঠিক রূপায়ণ করতে পারেনি। যদি বক্তব্যকে আরও স্পষ্ট করা হতো, চরিত্র নির্মাণে গভীরতা আনা হতো এবং নাটকের গতি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো, তাহলে এটি একটি শক্তিশালী নাট্যকর্ম হয়ে উঠতে পারতো।
অভিনয়ে প্রথমেই বলতে হয় বৌমা 'দীপা' চরিত্রে সোলাঙ্কী ব্যানার্জীর কথা। তিনি এই নাটকটিতে একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা নাটকটি চলনে সাহায্য করেছেন। কিছুটা তুহীন এবং জয় চরিত্রে মনীষ বিশ্বাস ও সৌম্য চৌধুরী চেষ্টা করেছে। যদিও তাদের যথাযথ শরীরী ভাষা অনুপস্থিত। জেস্টিকুলেশনের অভাব, মুভমেন্টের পৌনঃপুনিকতার ফলে শক্তিশালী চরিত্র নির্মাণে আশাহত করে। অনিল চরিত্রে নির্দেশক স্বয়ং সমীর দত্ত, যিনি স্বয়ং নাট্যকার তাঁর কাছে আরও প্রত্যাশা ছিল। প্রথমত অনিল কে? অনিল কেন গভীর মনস্তত্ত্বের কথা বলছে? অনিলের হাঁটুর ব্যথা অথচ চলনে কোমর বাঁকা করে সামনে ঝুঁকে থাকা অবস্থায় চলন সঠিক মুভমেন্ট মনে হয়নি। তাতে চরিত্রটি দুর্বল মনে হয়েছে। নাটকের শেষমুহূর্তে অনিল বক্তৃতা দিতে গেলে গুলিবিদ্ধ হন। কারা গুলি করেছে? কেন গুলি করে হত্যা করেছে? সেসব বিষয় অস্পষ্ট রেখেই নাটকটি শেষ হয়।
নাটকে অন্যান্য চরিত্রে ধনঞ্জয় পাল, মণিকা রায়, সৈকত সাহা, সমর্পিতা বিশ্বাস ও শিশুশিল্পী আরাধ্যা সরকার চলনসই।
নাটকে মৃণাল চ্যাটার্জীর আলো সকাল থেকে সন্ধ্যা একই আলোর ব্যবহার নিয়ে ভাবতে হবে। তবে ফ্ল্যাশব্যাকগুলোর ব্যবহার ভালো ছিল।
নির্দেশকের ভাবনায় বিমূর্ত মঞ্চটি বেশ ভালো লেগেছে। কিন্তু তাতে ছনের ছাউনির ব্যবহার যথাযথ মনে হয়নি। রাজেশ কান্তি সাহার মঞ্চ নির্মাণ ভালো।
নাটকে সমর্পিতা দত্তের পোশাকের ব্যবহার নিয়ে আরো ভাবতে হবে। একেবারে পাটভাঙা শাড়ি, ধূতি পড়ে ঘরের ভিতরে অভিনয় করতে একেবারে পাটভাঙা শাড়ি, ধূতির ব্যবহার অস্বস্তি লাগে। তপন কর্মকারের রূপসজ্জাতে এরবেশি কিছু করার নেই।
সৌমেন্দ্র নন্দীর আবহ নাটককে কিছুটা এগিয়ে যেতে অবশ্যই সাহায্য করেছে।
স্তানিস্লাভস্কি লিখেছিলেন 'হাউ টু ক্রিয়েট এ ক্যারেক্টার' অথবা স্যালডন ম্যইজনার লিখেছিলেন 'থিয়েটার টেকনিক'। আমাদের মগজে শান দিতে তাঁদের স্মরণাপন্ন হতেই হবে। নাটকের প্রয়োগে সাধারণভাবে কম্পোজিশন, পিকচারাইজেশন, মুভমেন্ট, লয় এবং প্যান্টোমাইমিং অ্যাক্টিং-এর মৌলিক বিষয়গুলোর যত বেশি উপস্থিতি দেখতে পাবো ততোই নাটক মনোগ্রাহী হয়ে উঠবে। যা একটি নাটকে সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করতে নির্দেশককে অনেক সাহায্য করতে পারে।