
আলোচনায় মনোজ দেবরায়
ভারত রঙমহোৎসব আধারিত রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয়, আগরতলায় নজরুল কলাক্ষেত্রে দ্বিতীয় সন্ধ্যায় সিগাল, গোহাটি নাট্য সংস্থার প্রাণপুরুষ বাহারুল ইসলাম নিবেদিত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন লেখক আন্তন চেখভের ছোট গল্প অবলম্বনে নাটক মুক্ত নিঃসঙ্গ পরিবেশিত হয়। গল্পে সাধারণ জীবনের গভীর মনস্তাতিক বিশ্লেষণ সূক্ষ্ম অথচ বিষন্ন ভাবে ধরা দেয়, কেননা এই ব্যস্ত সমস্ত সমাজে মানুষ বড় একা, মানসিকভাবে সে এতটাই নিঃসঙ্গ থাকে যে তার কথা শোনার মত মানুষ পাওয়া যায় না। আজকের এই নাটকে তারই প্রচেষ্টা, যা মনের গহীন থেকে নূরী তুলে এনে আত্মবিশ্লেষণে ভরপুর এক মন ভালো করা মুহূর্ত সৃষ্টি করে দেয়, যেখানে আসাম তথা ভারতবর্ষের প্রিয়তম সংগীতশিল্পীর অকাল প্রয়াত জুবিনের হৃদস্পন্দন অনুরনিত হয়ে ওঠে।
নাটকের মুখ্য চরিত্র প্রফেসর হায়াত হাজারিকা, জীবন সংগ্রামে তার জীবনের সংকটকালীন দিকগুলো ফুটে ওঠে। আজ প্রাক বার্ধক্যে এসেও অর্থ সাহায্য করতে হয় তার প্রতিষ্ঠিত আত্মজকে, আবার তার অমতে তার অপছন্দের পাত্রের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তারই আত্মজা। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই মানসিক অবসাদ তাকে গ্রাস করতে থাকে। অন্যদিকে পারিবারিক বন্ধুর একমাত্র কন্যার শিক্ষার দায়িত্ব পড়ে প্রফেসরের উপর, যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তার কাছে গচ্ছিত রাখা হয়। ফলে প্রফেসর সব সময়ই তার শিক্ষা, রুচি এবং তার সংস্কৃতি সবকিছু নিয়ে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত থাকে। অপরদিকে তার মিসেস বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তার নিয়মিত মানষিক চাপ বাড়ায় এবং মেয়েটির চলন বলন নিয়ে কটূক্তি করতেও ছাড়ছে না। সেই মেয়েটিও অস্থিরচিত্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করে নাম করতে চায়। কিন্তু সেই সাংস্কৃতিক চেতনায় সে উদ্বুদ্ধ হতে পারে না। এহেন জটিল এবং মানসিক অবস্থায় বার্ধক্যে এসে তিনি আরো মানসিক ভাবে ম্রিয়মাণ হয়ে ওঠেন। পরিশেষে সেই চপলমতি কন্যা যখন প্রকৃতপক্ষেই নাট্যকলা ক্ষেত্রে নিজেকে একনিষ্ঠভাবে উৎসর্গীত করে, তখন তিনি মানসিক স্বস্তি অনুভব করেন এবং জুবিন গর্গের সেই বিখ্যাত সংগীত অন্তরের অন্তস্থল থেকে যেন অনুরণিত হতে থাকে -
"মায়াবিনি আমার চোখে
চেয়ে দেখো,দেখো না চেয়ে ।
ভাঙ্গা মনে আমারও আছে কত আশা
ভেবোনা ,আজ বাঁধন তোমার
খুলে দিলাম আকাশ নিলে
ডানা মেলে দিও তোমার
ডাকে তোমার নতুন জীবন....
স্মৃতিগুলো কখনো
মনে পড়ে যায়,
পারবে কি ভুলতে
তুমি তখনো আমায়
মায়াবিনী আমার চোখে।"
এহেন নিঃসঙ্গতায় ভেসে যাওয়া খরকুটুর মত আবার যেন জুবিনেরই সংলাপ আঁকড়ে ধরে জীবন সায়াহ্নে এগিয়ে চলতে চেষ্টা করে, জুবিন গর্গের চিরন্তন সংলাপের কাছে আশ্রয় খুঁজে --
"মোর কোন জাত নাই
মোর কোন ধর্ম নাই
মোর কোন ভগবান নাই
মই মুক্ত,মইয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা "
এমনি করেই প্রফেসর হাজারিকা জীবন নামক একাকিত্বের শূন্যতা অবলম্বন করে আবার নতুন জীবন গড়ে তুলতে চেষ্টা করে।
নাটকের মুখ্য চরিত্রের অর্থাৎ প্রফেসরের ভূমিকায় ছিলেন স্বয়ং বাহারুল ইসলাম, যার অভিনয় নৈপুণ্য নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই, সারা মঞ্চটা যেন অভিনয় সৌরভে তিনি ভরে রেখেছেন পাশাপাশি তাঁর সহধর্মিনী মঞ্চে ও বাস্তবে শ্রীমতি ভাগীরথী বাঈ, স্বামীর অভিনয় সৃজনে আক্ষরিক অর্থেই সুযোগ্য ভূমিকা পালন করে গেছেন।
অন্যদিকে অসাধারণ কোরিওগ্রাফি
"গুন গুন গুন......"
গানের স্বানিন্ধে ভাব গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে দর্শকদের আবিষ্ট করে রাখেন। মনে হয় যেন জুবিনের পরমাত্মা বিশ্ব আত্মার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সার্থক এমন সংগীত চয়নে যার ফলে এমন ঐশ্বরিক নাট্যমুহূর্ত সৃষ্টি হতে পারে। ধন্যবাদ কোরিওগ্রাফারকে যার নিটোল চিন্তাধারায় এমন মোহময় রূপ সৃষ্টি হয়েছে।
মঞ্চে অন্যান্য যারা উপস্থিত ছিলেন, শ্রীমতি মিনাক্ষী শর্মা হাজারিকার ভূমিকায় ভাগীরথী বাঈ , সহজ-সরল ও বাস্তবতার যেন প্রতিমূর্তি। ছিলেন প্রশান্ত কলিতা , খানসামার ভূমিকায় এবং হোটেলবয়ের ভূমিকায় ছিলেন আরবাব ওমর।
নাটকে সঙ্গীত সুষমায় উদ্ভাসিত করেন প্রণব নিবিড়,
আলোর মায়াজাল বুনেন, দিবস বড়ুয়া এবং পোশাক পরিকল্পনা ভাগীরথী বাঈ।
নাটকের পাণ্ডুলিপি,ডিজাইন এবং নির্দেশনায় ছিলেন বাহারুল ইসলাম। অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি এমন একটি নাটক উপস্থাপনের জন্য। ধন্যবাদ এন এস ডি, টাই উইংকে তথা ভারত রঙ মহোৎসব আয়োজকদেরকে এত উন্নত এবং মননশীল নাটক নির্বাচন করার জন্য।