
আলোচনায় মনোজ দেবরায়
ভারত রঙ মহোৎসবে, নজরুল কলাক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয়ের তৃতীয় সন্ধ্যায় আধুনিক নৃত্যের জনক ইসাডোরা ডানকানের জীবন আধারিত নাটক গিফট অফ গডেস, রচনা করেন হরিকেস মৌর্য এবং নির্দেশনায় ছিলেন রমন কুমার। একক অভিনয় , যার নব্বই শতাংশই ছিল ডান্স ড্রামা রূপে।
ইসাডোরা ডানকান 1877-1929 একজন বিখ্যাত আমেরিকার নৃত্যশিল্পী যাকে আধুনিক নৃত্যের জননী বা অগ্রদূত বলা যায়। প্রথাগত আমেরিকায় প্রচলিত ব্যালের কঠোর নিয়ম ভেঙ্গে তিনি খালিপায়ে আলগা পোশাকে এবং প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে আবেগপূর্ণ নৃত্যশৈলী প্রবর্তন করেন। তার নৃত্য প্রাচীন গ্রিক শিল্পরীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল এবং তিনি শরীরের গতিবিধির মাধ্যমে অর্থাৎ বডি ব্যালেন্সের উপর ভিত্তি করে মানুষের আবেগের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতেন। তিনি তার সময়ের স্বীকৃত ব্যালের কড়াকড়ি এবং নিয়ম উপেক্ষা করে মুক্ত ছন্দের নৃত্য বা ফ্রি-ড্যান্স চালু করেন। তিনি আলগা কিউনিক বা গ্রিক স্টাইলের পোশাক পরে খালি পায়ে নাচতেন, তার নাচের মূল অনুপ্রেরণা ছিল প্রাচীন গ্রীক শিল্পকলা এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ। তিনি ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর নৃত্য পরিবেশন করেছেন এবং আধুনিক নৃত্যকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পকলা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল খুবই
ঘটনা বহুল এবং বিতর্কিত। তার 1927 সালে 14 সেপ্টেম্বর ফ্রান্সে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় যখন তার লম্বা স্কার্ফ গাড়ির চাকার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে।
ইসাডুরা ডানকান কেবল একজন নৃত্যশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমন একজন নারী যিনি সমতা ও স্বাধীনতার প্রতীক , তিনি তার কাজের মাধ্যমে নৃত্যের জগতকে চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন। তার নৃত্য প্রাচীন গ্রীক শিল্পকলা এবং ভাস্কর্য দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। তরঙ্গায়িত গতি বা ওয়েভমোশন, সমুদ্রের ঢেউ বা বাতাসের মতো ছন্দময় গতি ও প্রবাহমান নৃত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল যা তিনি শাস্ত্রীয় সংগীত তথা বিঠফেন, শপিন ইত্যাদি মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করে মনের গহীনে আবেগ প্রকাশ করতেন।
তার সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিতর্কিত পারফরমেন্সের মধ্যে অন্যতম হলো মারসেইয়েজ, যা এতটাই আবেগপূর্ণ ছিল যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের জাতীয় সংগীতের তালে এই নৃত্য পরিবেশন করে ফরাসিদের দেশ প্রেম এবং সম্ভ্রম জাগিয়ে তুলেছিলেন যা ওই সময়ে চিরস্মরণীয় হয়ে ছিল।
এই চরিত্রের উপর আধারিত নৃত্য ভিত্তিক এই নাটক। সত্যি, এ যে এক অন্য ধারার মনমুগ্ধকর অভিনয় শৈলী, যার নৃত্যের ছন্দে প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার করে কোন সুদূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যেখানে সমুদ্র গর্জনে মুখরিত বালুকাবেলায় জ্যোৎস্নালোকিত চাঁদের আলোয় যেন এক ঐশ্বরিক জগৎ রচনা করে। আবার সেই নৃত্যের তালেই ভোরের সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হয় প্রকৃতি, জীবনকে যেন বরণ করে নেয়,সেখানে নৃত্যকলা আর চন্দ্রকলা এতটা মাধুর্য বিস্তার করতে পারে তা অভিনয় না দেখলে বোঝা যায় না।
যদিও প্রথমে ধন্দে পড়তে হয় ইস্যাডোরা ডানকান-- চরিত্রের রূপদান করছেন অবশ্যই একজন নারী, কিন্তু না সেই নারীর ভূমিকায় ছিলেন মঞ্চাভিনেতা আবদাস আনসারী। যার অসামান্য অভিনয়শৈলীর এক অমোঘ আকর্ষণে এক ঘন্টা সমগ্র দর্শককে একাগ্র চিত্তে আকর্ষণ করে রেখেছেন , তিনি যে পরিসরে সমস্ত মঞ্চ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন নৃত্যের ছন্দে, এমনকি তার অভিনয় মনে করিয়ে দেয় বডি ব্যালেন্সের কথা, যেখানে একজন জিমন্যাস্ট ফ্লোর এক্সার সাইজের মাধ্যমে তার কলা প্রদর্শন করেন। অন্যদিকে এক হাতে সামান্য দু একটা সরঞ্জাম নিয়ে মঞ্চের দিশা পরিবর্তন করে একবার উরোপের হল তৈরি করে নিচ্ছেন,আমেরিকার নৃত্যমঞ্চ, আবার লন্ডনের মঞ্চে চলে যাচ্ছেন, মনে হচ্ছে যেন বালখিল্য চপলতায় ভর করে যেন মঞ্চাটাকে হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলছেন অথচ দর্শক চোঁখ ফেরাতে পারছেন না, এ যে শিল্পীর এক অনন্য সৃষ্টি। বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়।
নাটকটির সঙ্গীত মূর্ছনায় মুগ্ধ করেছেন আকাশ এবং রোহিত, যাদের সঙ্গীত ছাড়া অভিনয় কল্পনাও করা যায় না, কস্টিউম ডিজাইন করেছেন দীক্ষা কুমারী যা এক ব্যতিক্রমী ডিজাইন । স্টেজ ডিজাইন এবং সৃজনশীল আর্ট ফর্মে ছিলেন হৃষিকেশ মৌর্য। নৃত্য কলায় ছিলেন ঈসা। মেকআপে যতীন। প্রজেকশনে ছিলেন আলোক কুমার তুমাল। সর্বোপরি কনসেপ্ট এবং ডিরেকশনে রমন কুমার , যার সৃজনশীল মননে মূর্ত হয়ে উঠেছে এই নাটক। ধন্যবাদ রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয়কে এমন একটি উন্নতমানের নাটক নির্বাচন করার জন্য এবং আমাদেরকে দেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।