img

ভারত রঙমহোৎসবে রঙরূপ প্রযোজিত মানময়ী গার্লস স্কুল

আলোচনায় মনোজ দেবরায় 
 ১১ ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয় আয়োজিত ভারত রঙ মহোৎসবে স্থানীয় নজরুল কলাক্ষেত্রে অভিনীত হয় "মানময়ী গার্লস স্কুল"  রচনা রবীন্দ্রনাথ মৈত্র, সম্পাদনা এবং নির্দেশনা শ্রীমতি সীমা মুখোপাধ্যায় 
মানময়ী গার্লস স্কুল নাটকটি ১৯৩২ সালে রচিত এবং প্রকাশিত , খুব জনপ্রিয় এবং বহুল চর্চিত ও অভিনীত হাস্য রসাত্মক একটি নাটক যা এক সময়ে চলচ্চিত্রে  পর্যন্ত রূপায়িত হয়েছিল। গল্পটা অনেকটা এইরকম , বাংলায় জমিদার প্রথা চলাকালীন অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় দেড় দুশো বছর আগে জমিদারি প্রথা চলাকালীন তাদের মধ্যে অনেক বিষয় নিয়ে রেষারেষি চলতে থাকতো। কোনো গ্রামে হয়তো একজন ভালো কবিয়াল আছে তাই আমরাও কম কিসে ? সেই ধারণায় বশবর্তী হয়ে আমাদেরও  ওই ধরনের  কবিয়াল আনতে হবে , নয়তো জমিদারির সম্মান আর থাকেনা। আবার হয়তো পাশের জমিদারিতে একজন ভালো বৈদ্য আছে, আমাদেরও থাকতে হবে , তাতে প্রজাদের শরীর সুস্থ থাকবে ফলে চাষাবাদ ভালো হবে গ্রামে উন্নতি হবে ইত্যাদি। একই চিন্তাধারায় বশবর্তী হয়ে জমিদার দামোদর চক্রবর্তী  নিজ পত্নীর নামে একটি মেয়েদের স্কুল চালু করেন , এতে অগ্রণী ভূমিকা নেন জমিদার গিন্নী ।  তিনি নিজের মত করে  গ্রামের ছাত্রীদের পড়াশোনা শুরু করেন। শিক্ষার বিষয়বস্ত ছিল -- যেমন গৃহস্থালির কাজ, রান্নাবান্নার কাজ, কাপড় কাঁচার কাজ ইত্যাদি। কিন্তু জমিদার ভাবলেন শিক্ষিত এবং গ্র্যাজুয়েট শিক্ষক যদি  স্কুলে না থাকে তবে আর মান থাকে না তাই স্কুলের সেক্রেটারিকে দিয়ে বিজ্ঞাপন  দিলেন গ্রেজুয়েট শিক্ষকের জন্য। ওই বিজ্ঞাপন সেক্রেটারির  মনঃপুত না  হওয়ায় জমিদারের সঙ্গে পরামর্শ করে বিবাহিত শিক্ষক শিক্ষিকার জন্য পুনরায় বিজ্ঞাপন দিলেন। কারণ জমিদার কন্যার সঙ্গে সেক্রেটারি  মহাশয়ের আবার প্রণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা, তাই বিবাহিত শিক্ষক হলে তার প্রণয়ে আর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে না ।
যথাসময়ে তাদের মনমতো এক দম্পতি এলো শিক্ষকতা করতে , সবাই খুশি, প্রকৃতপক্ষে ওরা স্বামী-স্ত্রী ছিলেন না চাকরির খাতিরে স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করছেন  নিজেদের মধ্যে বুঝাপড়া করে। এভাবেই নাটক এগোতে থাকে এবং একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়। সেক্রেটারিও নিশ্চিন্ত মনে জমিদার কন্যাকে বরণ করে নেয় মূলত এই ছিল নাটকের গল্প। 
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, ১৯৩২ সালে নাটকটি স্টার থিয়েটারে  প্রথম মঞ্চস্থ হয়, ১৯৩৫ সালে এটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় তাতে কানন দেবী অভিনয় করেছিলেন, পরবর্তীকালে ১৯৫৮ সালে পুনরায় নাটকটি চলচ্চিত্র রূপে নির্মিত হয়। তাতে উত্তম কুমার ও কানন দেবী অভিনয় করেছিলেন। বলাই বাহুল্য একসময় চলচ্চিত্রে এবং মঞ্চে এটি একটি উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা, যা দর্শকদের মধ্যে আলোড়ন তুলেছিল। আজও সহজ সরল ও সাবলীল গ্রাম্য পরিবেশে নাটক এগিয়ে চলে,   মঞ্চসজ্জা দারুন, ভরা মঞ্চে কলাকুশলীরা স্বাভাবিক ছন্দে অভিনয় করে গেছেন। তার মধ্যে জমিদার এবং জমিদারগিন্নি অদ্বিতীয় দুজনেরই স্বপ্রতিভ অভিনয়। ভালো লেগেছে জমিদার গিন্নির
ছাত্রীদের ক্লাসরুমে পড়া নেওয়া এবং পড়া দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই সময়ের চিত্র ধরা পড়েছে। অন্যদিকে জমিদার কন্যা এবং সেক্রেটারির আড়াল আবডালে প্রণয় ঘটিত দৃশ্যেরও যথাযথ রূপায়িত হয়েছে, তাছাড়া স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকার কর্মসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার দৃশ্যটিও যথার্থ মনোরম বলা যেতে পারে। বাড়ির পুরানো চাকরের ভূমিকায় যিনি অভিনয় করেছেন তার অভিনয় দক্ষতার প্রশংসা করতেই হয়। তা  তিনি খুব সুচারুরূপে ফুটিয়ে তুলেছেন যা তার সমৃদ্ধ অভিনয় দেখে মুগ্ধ হতে হয়, সত্যিই তিনি দর্শকদের নজর কেড়েছেন। অথচ যার উপর ভিত্তি করে নাটকটি এগিয়ে যাওয়ার কথা অর্থাৎ  হাস্যরসাত্মক দৃশ্য বা তার সৃজন, অভিনয়ে কিন্তু তা অনুপস্থিত। যে নাটকের মূল উপজীব্য বিষয় সামাজিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে হাস্যরস সৃষ্টি করা, তা কিন্তু ফুটে ওঠেনি। যতটুকু হাসির উদ্রেক হয়েছে তা কিন্তু স্বাভাবিক মনে হয়নি। তবে নির্দেশকের উপর যেহেতু সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া আছে তিনি আরেকটু সক্রিয় হলে হয়তো বেশ কিছু হাস্যরসের মুহূর্ত সৃষ্টি করতে পারতেন এবং নাটকের চাহিদা অনুযায়ী পূর্ণতা  পেত। তবে হ্যাঁ নাট্য পরিবেশের চাহিদা অনুযায়ী দর্শকদের কিন্তু সেই সময়ে অর্থাৎ প্রায় ১৫০ বছর পেছনে নিয়ে যেতে পেরেছে যা অনেকটা টাইম মেশিনের মত,  সেখানেই এই নাটকটির সার্থকতা। তথাপি বলব নির্দেশক আরো একটু যত্নবান  হলে বাস্তবিকই এটি একটি অসাধারণ হাস্যরসাত্মক নাটক হতে পারত। ধন্যবাদ রঙরূপ থিয়েটারকে এমন সুন্দর সহজ সরল মানসিকতা সম্পন্ন একটি নাটক পরিবেশন করার জন্য। পাশাপাশি  রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয়,এন এস ডি ,দিল্লির কাছে অনুরোধ থাকবে আগামীদিনে নাট্যচয়নের ক্ষেত্রে আরো যত্নবান হওয়ার জন্য। আরো একবার ধন্যবাদ রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয়কে এমন একটি নাটক দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।