img

সম্মিলিত নাট্য প্রয়াসের উদ্যোগে 'রঙপীঠ' প্রযোজিত 'নিশি অতিথি'

আলোচনা করেন মনোজ দেবরায়
 গত ১৪ ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আগরতলা মুক্তধারা  অডিটোরিয়ামে সম্মিলিত নাট্যপ্রয়াসের সহযোগিতায় রংপিঠ প্রযোজিত, গৌতম দাস রচিত ও নির্দেশিত নাটক নিশী অতিথি মঞ্চস্থ হয়।
         এটি একটি ব্যাঙ্গাত্মক বা প্রহসনাত্মক নাটক যার মাধ্যমে সমাজের তথাকথিত এক শ্রেণীর মানুষ, যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থ করার জন্য সব ধরনের নিকৃষ্ট ধরনের কাজকর্ম করতে সচেষ্ট হয় অর্থাৎ যাদের মানসিকতায় সমাজ কলুষিত হয়, তারই প্রতিবাদের মাধ্যম বেছে নেওয়া হয়েছে অশরীরী মানুষ বা আত্মা, আমাদের চিন্তা চেতনা অনুযায়ী যার কোন বিনাশ নেই। গল্পটা যেমন সাজানো হয়েছে তা অনেকটা এইরকম -- একটা নির্জন গ্রাম্য শ্মশানঘাট সেখানে প্রতিনিয়ত মৃতদেহ দাহ করার জন্য নিয়ে আসা হয়। স্বাভাবিকভাবেই শ্মশানের ডোম সেই কার্য সমাধা করে থাকে। কিন্তু প্রায় সময় সে একটা ধন্দে থাকে এই ভেবে যে, সৎকার করার পর যেন তার সঙ্গে মৃত মানুষগুলি আন্তরিকভাবে কথা বলে , তাদের জীবনের কথা তাদের দুঃখের কথা বলতে চায়। জীবিত অবস্থায় তাদের উপর যে অত্যাচার করা হয়েছে , যে সমস্ত গঞ্জনা তাদের পোহাতে হয়েছে,সেই মৃতমানুষের  কথা যেন সে অনুভব করতে পারে, তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় ।  এমনকি এই মৃতদেহগুলি জীবিত না মৃত  এই ব্যাপারে সংশয় দেখা দেয়।  সে বুঝতে চেষ্টা করছে মানুষ মরে গেলেও কি একই অবস্থায়  তাদের আত্মা বিরাজ করে!!  সে ধন্দে পরে, সে ভাবলেলেশহীন  হয়ে পরে। এখানে তার সাথী একমাত্র  সেই শ্মশান ঘাটে যে মন্দির আছে তারই পূজারী। তিনি সবসময় মন্দিরের পূজা আর্চা নিয়ে থাকেন । সে তাদের কথা সেই পূজারীর সঙ্গেই আলোচনা করে এবং সেই মৃতদেহগুলো  অর্থাৎ অশরীরী আত্মাগুলো যে চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়, তার সঙ্গে কথা বলে তা পূজারীকে  জানায়। কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারছ না পূজারী তার কথা কেন বিশ্বাস করছে না এবং তার কথার কোন গুরুত্ব দিচ্ছে না। সে সব সময়ই  বুঝাতে চেষ্টা করছে  এগুলো তার মনের ভুল।  তবে তার কথা শুনে পূজারী এটা বুঝতে পারছে যে কোন আত্মা বেঁচে থাকতে হয়তো খুব প্রভাবশালী ছিল, খুব ক্ষমতাশালী ছিল,  রাজনৈতিকভাবে খুবই প্রভাবশালী ছিল , কিন্তু তাদের মন ওই ধরনের ছিল না স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে লোভ লালসা অজ্ঞতা স্বার্থপরতা জীবিত অবস্থায় তাদের যেই অহং বোধগুলো ছিল, মৃত্যুর পরেও সেই ভাব এবং ক্ষমতা তাদের চিত্তে প্রকট হয়ে আছে। তাই মৃত্যুর পরেও তারা একই ক্ষমতা অনুভব করতে চাইছে।  নিজেদের যে মৃত্যু হয়েছে তা ওরা বুঝতে পারছে না। ডোমের কথাগুলো বা কল্পনাগুলো এরই প্রতিফলন।
       দ্বিতীয় পর্যায়ে মঞ্চে আসে যমালয়ের বিচার সভা, সেখানে চিত্রগুপ্ত  যমরাজ, সবাই রাজসভাতে বিচার কার্য সমাধা করছে এবং তাদের কৃতকর্মের জন্য নির্দিষ্ট সাজার বিধান দিচ্ছে। কিন্তু এই সামাজিক জীবগুলোর মনের সেই অবস্থা আগের মতই বিরাজ করছিল।  তার থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারছে না , মৃত্যুর পরেও তাদের সেই মানসিক বিকারের হাত থেকে তাদের নিস্তার নেই। প্রকৃতপক্ষে নাটকে যা বলতে চাওয়া হয়েছে তা হল সমাজকে সুন্দর ও সুস্থ রাখতে গেলে প্রতিটা মানুষকেই তাদের মানবিক দিকগুলোর মাধ্যমে, নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের সুকুমার বৃত্তিগুলিকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে হবে এতেই সমাজ সমৃদ্ধ হবে পাশাপাশি দোষগুলি  অর্থাৎ  সমাজ  কলুষিত করে এরকম চিন্তা পরিহার করতে হবে। তবেই সমাজ আত্মপলব্ধির মাধ্যমে  সুস্থ ও সুন্দর হয়ে উঠবে ।
যদিও এ ধরনের স্ক্রিপ্ট বা পান্ডুলিপি আগে অনেক হয়েছে, উদ্দেশ্য একটাই মানুষের সুস্থ চিন্তা চেতনা   আঁকড়ে  ধরে সমাজকে সঠিক দিশা  দেখানো। 
              এবার আসি অভিনয়ের ক্ষেত্রে, মূলত দুটি চরিত্রের আবর্তে যেন অন্য চরিত্রগুলো আবর্তিত হচ্ছে, এতে ডোম এবং পূজারী গৌতম দাস এবং মনোজিৎ দেবরায় -- অন্য চরিত্র গুলোর সাপোর্ট পেয়ে তাদের নিজেদের অভিনয় দক্ষতা  সাবলীল ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে। তবে উভয়েই নিজ নিজ চরিত্রে আরো আত্মস্থ হতে পারলে ভালো হতো। বিশেষত  হাস্য রসাত্মক মুহূর্তগুলো আরো প্রাঞ্জল হতে পারতো। পাশাপাশি পূজারী অনেককেই প্রসাদ গ্রহণ করার কথা বললো  কেউ কিন্তু তা গ্রহণ করেনি এটা ব্যতিক্রম, যদিও শ্মশান বলে হয়তো  প্রসাদের প্রতি আগ্রহ কম ছিল। অন্যান্য চরিত্রগুলো স্বচ্ছ ও সাবলীলভাবে অভিনয় করে গেছেন তাতে নাটকের সমৃদ্ধি ঘটেছে। 
          এ নাটকের আকর্ষণীয়  দিক ছিল মঞ্চ নির্মাণ, রাজেশ কান্তি দাস দারুন মঞ্চ বানিয়েছে, খুবই চিত্তাকর্ষক ও অর্থবহ মঞ্চ, তাছাড়া সবাই সাবলীলভাবে মঞ্চটা ব্যবহার করেছে বলেই তার মাধুর্য বেশি করে ফুটে উঠেছে। আলোতে ছিলেন জয়ন্ত দে, খুবই ভালো এবং প্রয়োজন ভিত্তিক আলো ফুটে উঠেছে, বিশেষত জোৎস্নালোকিত রাতের দৃশ্য।
        পান্ডুলিপি এবং নির্দেশনায় ছিলেন গৌতম দাস, আগেই বলেছি খুবই উৎকৃষ্ট মানের পান্ডুলিপি ছিল তবে যমরাজের দরবার বা রাজসভায় যমরাজ এবং চিত্রগুপ্তের উপস্থিতি টের পাওয়া গেছে কিন্তু যমদূত সম্ভবত অনুপস্থিত, এদিকে একটু খেয়াল রাখলে ভালো। এত বড় টিমকে আগলে রাখা খুবই কষ্টকর, তথাপি টিম ওয়ার্ক এর দিকে আরও  যত্নবান হলে নাটক আরো সহজে এগিয়ে যাবে। কয়েকটা চরিত্রকে মনে হয়েছে যেন আলগা হয়ে ইতস্তত ঘোড়াফেরা করছে, একটা চরিত্র তো নাটক থেকে বেরিয়ে বাস্তবে চলে এসছে মনে হলো। যদিও তাদের বয়স খুবই কম তথাপি এই দিকগুলো ধরিয়ে দিলে আগামী দিনের সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয়। 
          এ নাটকে অন স্টেজ এবং অফ  স্টেজে আর যারা ছিলেন -- অপরূপা দেবনাথ, রুমা সরকার , বাসন্তী সিনহা, অনির্বাণ ঘোষ, জয়শ্রী সূত্রধর, সজল সাহা, পূজা বিশ্বাস, প্রীতম সাহা, ঋতব্রত পোদ্দার, শুভদীপ ঘোষ, মিঠুন পাল, শ্যামল বিশ্বাস এবং অজয় মোহন ত্রিপুরা। ধন্যবাদ রংপিঠ নাট্য সংস্থাকে এমন সুন্দর ও মঞ্চ সফল একটি নাটক উপস্থাপন করার জন্য, আশা করছি আগামী দিনে আরো ভালো নাটক দেখতে পাবো।ধন্যবাদ সম্মিলিত নাট্য প্রয়াসকে এমন একটি ভালো নাটক উপস্থাপন করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।