
পার্থসারথি গুপ্ত
সম্মিলিত নাট্যপ্রয়াস-এর উদ্যোগে এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, ত্রিপুরা সরকারের সহযোগিতায় রূপম-এর নিবেদন "বাকি ইতিহাস"-বাদল সরকারের নাটকের এক অনন্য প্রয়োগ। কুমার শঙ্কর পালের নিপুণ নির্দেশনায়, মূল নাটকের মনস্তাত্ত্বিক আঙ্গিকগুলি একে একে প্রস্ফুটিত হয়েছে জয় দত্ত, কুমার শঙ্কর পাল, সোনালী রায় বাগচী ও অনিন্দিতা সেন-এর বলিষ্ঠ অভিনয়ে।
নাটকটির দৃশ্যগুলি চাইনিজ বক্সের ন্যায় সংগঠিত। ফ্রেমের মধ্যে ফ্রেম, গল্পের মধ্যে গল্প-একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে এক মায়াজাল রচনা করে। কয়েকটি দৃশ্যের পর শরদিন্দু ও বাসন্তীর আপাতদৃষ্টিতে পরিলক্ষিত সুখী দাম্পত্য কোথাও যেন সীতানাথ ও কণার সম্পর্কের জটিলতায় নতুনভাবে প্রকাশ পায়।
বাদল সরকারের নাটক "বাকি ইতিহাস" প্রসেনিয়াম থিয়েটারের মঞ্চের জন্যই রচিত এবং সেভাবেই অভিনীত। যদিও তাঁর পরবর্তী পর্যায়ের নাট্যসৃষ্টি বিকল্প থিয়েটার বা থার্ড থিয়েটারের সূচনা করে, "বাকি ইতিহাস" "ড্রয়িং রুম থিয়েটার" বা বৈঠকখানা থিয়েটারের ঘরানায় রচিত। তবে এ নাটকে অ্যাবসার্ড থিয়েটারের আভাস পাওয়া যায়। বিশেষ করে যখন সীতানাথের আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধান শরদিন্দুর গল্পরচনার উপাদান হিসেবে প্রকাশ পায়। বাঁচার অর্থ, বেঁচে থাকার উপাদান ও প্রচেষ্টা-এই নিয়ে অনেক চুলচেরা বিশ্লেষণ আছে নাটকে। কিন্তু শেষে যখন ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক কলহ ও ইন্দ্রিয়প্রবৃত্তি চরিতার্থের গল্প ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে ব্রেশ্ট-এর এপিক থিয়েটারের আদলে বিশ্বব্যাপী মহাকাব্যের রূপ নেয়, কোথাও যেন মূল নাটকের প্রয়োগের ভারসাম্য লোপ পায়। যদিও প্রয়োগটি অত্যন্ত নান্দনিক এবং বলিষ্ঠ অভিনয় দ্বারা দর্শকমনে জয় করতে যথেষ্ট সক্ষম, কিছু সংলাপ সম্পাদনা নাটকটিকে আরও সময়োপযোগী করে তুলতে সাহায্য করবে।
নাটকটির মঞ্চ পরিচালনা, নির্মাণ, আলো ও আবহ মঞ্চায়নকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু শব্দ প্রক্ষেপণে তাল কাটে, যখন সদর দরজার শিকলের আওয়াজ বারবার মনে করিয়ে দেয়-আধুনিক ও সমকালীন বাড়িঘরের সদর দরজায় আমরা শিকল বা খিল আদৌ লাগাই কিনা। এই শব্দের বিকল্প প্রক্ষেপণের প্রয়োজন।
জীবনানন্দ দাশের উদ্ধৃত কবিতাংশ "বাকি ইতিহাস"কে এক মহাকাব্যিক মাত্রা এনে দেয়। এখানে বাদল সরকার ও ব্রেশ্ট মিলেমিশে এক হয়ে যান।
"হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়-পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা-প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়, শূন্য মনে হয়।"
সীতানাথের আত্মহত্যা, শরদিন্দুর গল্পে তাঁর অল্টার ইগো খুঁজে পাওয়া, একজনের বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পাওয়া, অন্যজনের রসদ হারানোর গল্প-কোথাও যেন আমাদের সতর্ক করে দেয় জীবনের মধ্যে লুক্কায়িত থাকা এক মহাশূন্যের কথা। সেই মহাশূন্যের গল্পই "বাকি ইতিহাস"।