
নারায়ণ দেব
সম্মিলিত নাট্য প্রয়াসের উদ্যোগে ১১ এপ্রিল,২০২৬ নাট্যভূমি আগরতলার মুক্তধারা মঞ্চে উপস্থাপন করল তাদের ৩৫ তম প্রযোজনাঃ ' ঘুণ'। নাটক ও নির্দেশনাঃ সঞ্জয় কর। সহযোগী : চন্দ্রস্নাত কর।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে 'ঘুণ' একটি প্রয়োজনীয় নাট্য প্রযোজনা। নাট্যভূমির এই প্রয়াস বিনোদনের স্বস্তি দেয় না; বরং সমাজের দিকে নির্মমভাবে প্রশ্ন তোলে।
সঞ্জয় করের রচনায় সুপার ইম্পোজ করে একটি মেয়ের ছবিকে অশ্লীল রূপ দিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে নাট্য পরিসর নির্মিত হয়েছে, তা নিছক একটি ঘটনা কেন্দ্রীক নয়- এটি আমাদের ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থার এক কঠোর ভাষ্য।
নাটকের কাহিনি রামেশ্বর ও রমার একমাত্র কলেজে পড়ুয়া মেয়ে দিশার ছবি সুপার ইম্পোজ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়াকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও তা কখনোই ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে তা একটি কাঠামোগত রূপ নেয়, যেখানে প্রশাসনিক দায়হীনতা, আর্থিক লোভ এবং সামাজিক নীরবতা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পরে। নাটকটি স্পষ্ট ভাবে প্রশ্ন তোলে এই অবস্থার দায় কার?
ঘুণ শব্দটি কোনও একক চরিত্রের দোষ নির্দেশ করে না; বরং গোটা ব্যবস্থার বিষাক্ত ছোবলের ইঙ্গিত দেয়। এই দংশন সমাজের - যে সমাজ মাতৃত্বকে ঘটা করে পূজা করে, অথচ বাস্তবে সমাজের নারীর নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।
অবশ্য এখনও সমাজ সবটা নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে যায় নি। চক্রান্তের শিকার দিশার পাশে দাঁড়ায় তার মা - বাবা ও সহ -পাঠিদের একটা বড় অংশ। যা আমাদের আশার আলো দেখায়।
নাট্য নির্মাণে সঞ্জয় কর এক লিনিয়ারিটি রেখে একেবারেই গল্প বলার ঢঙে আখ্যানটিকে বিবৃত করেন। দৃশ্যগুলিকে এতটাই পরিপাটি করে সাজিয়ে দেওয়া হয যে মঞ্চের প্রতিটি চরিত্রের অবস্থানিক এক সুঠাম চিত্র রচিত হয় পুরো নাটক জুড়ে। পরিচালকের মননশীল চিন্তা ভাবনায় বৃহৎ ইজেলে যে মনোরম দৃশ্য ছবি তৈরি হয় তা অতি অবশ্যই নাট্যটিকে সু-উচ্চ মানে পৌঁছে দেয়। তবে শুরুর কোরিওগ্রাফির
সময়- সীমা এবং দৃশ্যান্তরের কোরিওগ্রাফির পরিকল্পনা নাট্যচলনের সহায়ক ভূমিকা পালন না করে মাঝে মাঝে খানিকটা হলেও মূল নাট্যকে ছাপিয়ে যায়। এর সময়-সীমা কিছুটা ছেঁটে দিলে নাট্য দর্শনটি আরও জমাটি হবে।
এই নাটকের সবচেয়ে শক্তিশালী ও উল্লেখযোগ্য দিক নিঃসন্দেহে প্রতিটি অভিনেতা ও অভিনেত্রীর অসাধারণ বাচিক অভিনয়। সংলাপ উচ্চারণে যে শৃঙ্খলা, কন্ঠ নিয়ন্ত্রণে পরিমিতি এবং আবেগ প্রকাশে সংযম দেখা যায়, তা খুবই প্রশংসনীয়।
অভিনয়ে অন্তরীপ রায়, চন্দ্রস্নাত কর, বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী, তমোঘ্ন ধর, অসীম কুমার রায়, দেবর্পিত চক্রবর্তী, অন্বেষা আচার্য, বিক্রম নাথ, পোর্শিয়া চৌধুরী, পল্লবী দেব, সুমিতা ভৌমিক, শুভ্রাশিষ ভট্টাচার্য, বিক্রম নাথ, প্রতীক্ষা দেবনাথ, সুপ্রীতি ঘোষ ও সঞ্জয় কর প্রত্যেকেই নিজ নিজ চরিত্রে দৃঢ় উপস্থিতি রাখেন।
দলগত অভিনয়ের ঐক্য নাটকটির বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখে।
অসীম কুমার রায়ের মঞ্চ ভাবনা নাটকের ঘটনা প্রবাহকে পরিস্কার ভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করেছে। সুকান্ত ও সঙ্কর্ষণ প্রয়োজনীয় আবহ নির্মাণে যেমন মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তেমনি সানি সরকার তার সঠিক প্রক্ষেপন করেছেন। অনির্বাণ বনিকের আলো পরিকল্পনা এবং খোকন মিঞার প্রয়োগ নাটকে অন্ধকার, দ্বিধা ও সংকটকে দৃশ্যমান করেছে। সুপ্রীতি ঘোষের রূপসজ্জা ও পোষাক পরিকল্পনা চরিত্রগুলির সামাজিক অবস্থান ও বাস্তবতাকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে। সুদীপ্ত মজুমদারের কোরিওগ্রাফি নাটকের চলনকে মসৃন করেছে।
সব মিলিয়ে ' ঘুণ ' একটি প্রাসঙ্গিক বিবেকনাড়ানো নাট্য প্রযোজনা। একটি মেয়ের ছবিকে সুপার ইম্পোজ করে ভাইরাল করার ঘটনা আমাদের সামাজিক নৈতিকতার মৃত্যু নিয়ে কথা বলে। নাটক শেষ হয়ে যায় কিন্তু তার রেশ থেকে যায়। এমন একটি বাস্তবধর্মী প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য নাট্যভূমির প্রতি রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।