
পার্থ প্রতিম আচার্য
১০ই মে সম্মিলিত নাট্য প্রয়াস-এর অন্তর্গত রাজ্যের অন্যতম বিশিষ্ট নাট্যদল শিল্পতীর্থ-এর প্রযোজনা "পুষ্পহার" মঞ্চস্থ হল মুক্তধারা প্রেক্ষাগৃহে। বাইরে তখন বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যা। আবহাওয়ার কারণে নাটক শুরু হতে কিছুটা দেরি হলেও দর্শকাসনে উৎসাহের ভাটা পড়েনি; বরং প্রায় হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতিই প্রমাণ করল যে আগরতলার নাট্যদর্শক এখনও মননশীল প্রযোজনার প্রতি সমান আগ্রহী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কবিতা "পুরস্কার"-কে নাট্যরূপ দিয়েছেন এবং প্রযোজনাটি পরিচালনা করেছেন শ্রী কার্তিক বণিক।
নাটকের এই আলোচনায় প্রথমেই মঞ্চসজ্জা নিয়ে বলা যাক। মঞ্চসজ্জা সম্পূর্ণভাবেই বাহুল্যবর্জিত। ডিপ স্টেজে একটি স্টেয়ার বক্স এবং মঞ্চের দুই প্রান্তে দুটি প্ল্যাটফর্ম এই সামান্য উপকরণ দিয়েই নির্মিত হয়েছে সমগ্র নাট্যপরিসর।
প্রথম দৃশ্য শুরু হয় কবি ও তাঁর স্ত্রীর কাহিনির বুনোট, যাকে আমরা প্লট বলি, তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এমন দর্শকের বাঁদিকের প্ল্যাটফর্মে, যা একজন কবির বাড়িকে চিহ্নিত করেছিল। কথোপকথন থেকে জানা যায় তাঁদের জীবনের দারিদ্র্যের কথা। কবির স্ত্রী এতে দুঃখিত হলেও কবি অনেকটাই অন্য জগতের মানুষ। জাগতিক প্রাচুর্য তাঁর কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু স্ত্রীর কথায় সে রাজার বাড়ি যেতে রাজি হয় এবং তাঁর স্ত্রী তাঁকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাজবাড়ি পাঠায়।
মিডল জোনে তৈরি হয় রাজদরবার, যেখানে মহামন্ত্রী এক বিদ্রোহীকে ধরে আনে। বিদ্রোহীর নাম জীবন। সে জানায় তার দুঃখ, দুর্দশা এবং বঞ্চনার কথা। কিন্তু কোনো সুবিচার সে পায় না।
সভায় রাজার কাছে ব্রাহ্মণবেশী গুপ্তচর, কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা, নট সবাইকে অর্থদান করা হয়। সবাইকে দান দিয়ে শেষে ডেকে আনা হয় কবিকে। সবাইকে তাড়িয়ে রাজা কবির কবিতা শুনতে চায়। কবি সরস্বতী বন্দনা করে রামায়ণের সীতার অগ্নিপরীক্ষার বর্ণনায় প্রবেশ করে ঘটনাটি মঞ্চে দেখানো হয়। মাঝখানে এক বালক প্রবেশ করে। সে রাজাকে বলে ওষুধ নেই, খাবার নেই ইত্যাদি। বিষয়টি কিছুটা প্রক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। রাজারও কোনো সহৃদয় হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। রাজা আবার কবির কবিতা শুনতে চায়। কবির কবিতায় এবার উঠে আসে মহাভারতের যুদ্ধ শেষে কৌরবদের মৃতদেহের মাঝে গান্ধারীর শোকাতুর দৃশ্য যা মঞ্চে অভিনীত হয়। শেষে মহারাজ তৃপ্ত হয়ে কবিকে বলেন "কি চাও তুমি? ধন্য কবি, ধন্য তুমি।"
শেষ দৃশ্যে কবি বাড়ি ফিরে আসে গলায় শুধুমাত্র একা। ফুলের মালা নিয়ে। তাঁর স্ত্রী যদিও ভেবেছিল অনেক ধনরত্ন নিয়ে কবি ফিরবে, কিন্তু এখানেই বোঝা গেল কবির কাছে পার্থিব বিষয়ের চেয়ে সম্মান অনেক বড়। স্বামী-স্ত্রী দুজনের ভালোবাসার দৃশ্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয় কাহিনি।
নাটকটিতে যারা অভিনয় করেন তাঁদের মধ্যে মহারাজার চরিত্ররূপে রতন শর্মাকে বেশ ভালো লেগেছে। কবির ভূমিকায় রূপম বণিকের উচ্চারণ আরও স্পষ্ট হলে ভালো হতো। দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন সীতার ভূমিকায় নন্দিনী মজুমদার এবং গান্ধারীর ভূমিকায় কনীনিকা বণিক।
এই নাটকের সবচেয়ে বড় সাফল্য নাটকের আলো। সাদামাটা মঞ্চে সীতার অগ্নিপরীক্ষা এবং গান্ধারীর শোকাতুর দৃশ্যে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছেন বরেণ্য আলোকশিল্পী প্রদীপ দাস। তার আলো নাটকের এই দুটি দৃশ্যকে অনেকটাই উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, যেখানে অভিনেত্রীদ্বয়ের অভিনয় হৃদয়স্পর্শী হয়ে উঠেছে। রূপসজ্জায় পীযূষ কান্তি রায় বরাবরের মতোই চরিত্রগুলিকে ভালোভাবে রূপ দিয়েছেন। তবে কিছু পোশাক আরও পরিচ্ছন্ন হতে পারত বলে মনে হয়েছে, বিশেষ করে রাজা ও মন্ত্রীদের। পীযূষ ব্রাহ্মণের চরিত্রটিকে দারুণ সাজিয়েছেন। শব্দ নিয়ন্ত্রণে হলের অ্যাকুস্টিক সিস্টেমের দুর্বলতা ঢেকে দিয়েছেন শিশির কর। আবহসঙ্গীতে অনিমেষ, সৌরভ, দীপায়ন এবং কনীনিকা পরিমিতি বজায় রেখে ভালো কাজ করেছেন। একই কথা প্রযোজ্য মঞ্চ নির্মাণে সুশান্তর বেলায়।
কবিতার উপর ভিত্তি করে নির্মিত এই নাটকে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো রাজার চরিত্রচিত্রণ। মূল কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজাকে শুরু থেকেই উদার, গুণগ্রাহী ও শিল্পবোদ্ধা রূপে উপস্থাপন করেছিলেন; সেখানে তাঁর চরিত্রে বিশেষ পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু নাট্যরূপে রাজাকে প্রথমদিকে কিছুটা কঠোর বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রূপে দেখানোর একটি প্রয়াস দেখা যায়।
সমস্যা হলো, পরবর্তীতে সেই অবস্থান থেকে রাজার মানসিক পরিবর্তনের দিকটি নাটকে স্পষ্টভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে নাটকের শেষ পরিণতি এবং রাজার আচরণের মধ্যে একটি সামান্য অসামঞ্জস্য থেকে যায়। যদি নাট্যকার মূল কবিতার ভাবনাটিকেই সম্পূর্ণ অনুসরণ করতেন, তাহলে সম্ভবত চরিত্রটির ধারাবাহিকতা আরও সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠত। শেষ পর্যন্ত রাজা কবির কাব্যে আপ্লুত হয়ে তাকে পুষ্পহার প্রদান করেন, কিন্তু সেই আবেগঘন মুহূর্তে পৌঁছানোর নাট্যযাত্রাটি আরও স্বাভাবিকভাবে নির্মিত হলে প্রভাব আরও গভীর হতে পারত।
অতএব বলা যায়, নাট্যকারের উপস্থাপনায় একটু ভাবগত স্পষ্টতা নাটকটিকে আরও পূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। সব মিলিয়ে একটি সুন্দর উপস্থাপনার জন্য শিল্পতীর্থকে ধন্যবাদ