img

রায় কচাগ: ত্রিপুরার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল বীরগাথার মঞ্চায়ন।

সঞ্জয় কর
সম্মিলিত নাট্য প্রয়াসের দ্বিতীয় শনিবারের ধারাবাহিক নাট্য উপস্থাপনায় এ মাসের নাটক ছিল সুরপঞ্চম প্রযোজনা 'রায় কচাগ ' । স্বনামধন্য লেখক অলক দাশগুপ্তর 'সেনাপতি রায় কচাগ ' কমিক্স থেকে নাটকটি রচনা করেছেন সুপরিচিত নাট্যকার পার্থ মজুমদার। 
পঞ্চদশ শতকে রাজা ধন্য মানিক্যের সময়টা ছিল সব দিক থেকে টালমাটাল।  একদিকে আরাকান থেকে কুকীদের যখন তখন উপদ্রব, অন্যদিকে বাংলার নবাব হুসেন শাহ'র আক্রমণ, তার উপর রাজঅন্তপুরের রাজ বিরোধী ষড়যন্ত্র। সেই সময়ে রিয়াং সম্প্রদায়ের দুই অসীম সাহসী যুবক কচাগ ও কসম , তাদের বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে প্রথমে সৈন্য বাহিনীতে সেনা হিসেবে স্থান পায় এবং পরে কচাগের বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে তাকে দেওয়া হয় সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব। একের পর এক যুদ্ধ জয়ের পর সেনাপতি কচাগকে রাজা একসময়  সর্বোচ্চ রাজ সম্মান ' রায় ' উপাধিতে ভূষিত করেন। বিপুল বাহিনী ও সমরাস্ত্রের বিরুদ্ধে স্বল্প সৈন্য , অসীম সাহস ও রনকৌশলে আপন ভূমিকে রক্ষার এই ইতিহাস সবসময়ই প্রাসঙ্গিক।
 মঞ্চে কাহিনীর বিস্তার ঘটেছে বর্তমানের দাদু ও নাতির ইতিহাস কথনের মধ্য দিয়ে। কাহিনীতে জামিলছঙ নামে লোককথার এক অতি মানবের অন্তর্ভুক্তি উপস্থাপনায় এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। 
কাহিনীকে মঞ্চযোগ্য উপস্থাপনার জন্য নির্দেশক থিয়েটারের বিভিন্ন অনুষঙ্গকে কাজে লাগিয়েছেন।সমবেত কোরিওগ্রাফি, সঙ্গীত, দৃষ্টিনন্দন উপকরণ, পোশাক ও রূপসজ্জা, মঞ্চ, আলো সবকিছুতে বাহুল্য বর্জন করে নির্দেশক নাটকের কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বিস্তৃত কাহিনীকে আপ স্টেজে দুদিকে উত্তুঙ্গ পাহাড়ের অবয়ব আর আপ সেন্টারে একটি সিঁড়িকে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে সামনে পর্যাপ্ত অভিনয়ের স্পেস থাকে। এই স্পেসকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও পাহাড়ের ব্যবহার তেমন ভাবে হয় নি।  নাটকের প্রতিটি শাখায় বিশেষজ্ঞ শিল্পীদের কাজ প্রযোজনাটির উৎকর্ষ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে সুমন ভট্টাচার্যের শৈল্পিক নির্মাণ - গোসাপ ও সাদা হাতি -  নাটকের সম্পদ। এ দুটিকে জঙ্গলের আলোছায়ায় আরও রহস্যময় ভাবে দেখতে ইচ্ছে করছিল । পীযূষ কান্তি রায়ের পোশাক পরিকল্পনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাহিনীর কালকে সার্বিকভাবে তুলে ধরেছে, কিন্তু রিয়াং আদিবাসীদের রূপসজ্জা ও একই রকম সাদা পোশাকের ব্যবহার, রাজ পারিষদ দ্বয়ের পোষাক নিয়ে ভাবা দরকার। দেবজ্যোতি লস্কর নাটকের কোরিওগ্রাফিতে তার স্বকীয়তা যুদ্ধ প্রস্তুতি ও গ্রামবাসীদের সমবেত চলনে রক্ষা করেছেন। গানের সুর ও আবহে অমর ঘোষের সুরে সেই কালটাকে ছুঁতে পারলে ভাল লাগত।  সৌম্যেন্দ্র নন্দীর আবহ নাটকের দাবি পূরণে সমর্থ হলেও আবহ প্রক্ষেপণে ও সংলাপের মধ্যে ব্যালেন্সের বিষয়ে যত্নশীল হতে হবে। সঞ্জু দাসের আলোক পরিকল্পনায় আরো সুযোগ রয়েছে । ডাউন স্টেজে যেহেতু পর্যাপ্ত স্পেস রয়েছে সেখানে বিভিন্ন খন্ড দৃশ্যে জোনের পরিকল্পনা কুশীলবদের স্বাভাবিক চলনকে ব্যাহত করেছে। 
নাটকটির মূল দুই চরিত্র - কচাগ ও কসমকে সাদামাটা ভাবে ভাল লেগে যায়। কিন্তু,  সারা নাটকে অভিনয়ের যে বৈচিত্র্য , ঘাত প্রতিঘাত বীরত্ব, গ্রামের সারল্য থেকে সেনাধ্যক্ষের গুরু দায়িত্ব- পিন্টু দাস ও রজত দাস যেন সবটুকু সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারলেন  না। বিভিন্ন সময়ে যে এনার্জি, যে ক্ষিপ্রতার প্রয়োজন ছিল তা কণ্ঠ ও শরীর দিয়ে যেন কুলিয়ে উঠতে পারলেন না। চরিত্রের বহুমাত্রিকতা প্রকাশ করতে আরও ভাবতে হবে দুজনকে। রাজা ধন্যমাণিক্য ও নবাব হুসেন শাহ'র প্রধান সেনাপতি গৌর মল্লিকের চরিত্রে আশিস বিশ্বাস কণ্ঠ ও শারীরিক অভিনয়ে দারুণ ভাবে চরিত্রানুগ। সুপরিকল্পিত পোশাক তাঁর চরিত্রকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। যদিও, গৌর মল্লিক হিন্দু হওয়া সত্বেও কেন মুসলিম দাড়ি - এই প্রশ্নটা থেকেই যায়। অন্তরীপ রায় ও অনিকেত চক্রবর্তী একাধিক চরিত্র সামলানোর জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখেনি । স্বল্প সময়ে বারবার পোশাক বদলের চাপ সামলানোর পরও কুকী চরিত্রে দুজন ও কবি চরিত্রে অনিকেত নজর কেড়েছেন। জামিলছং এ নাটকের একটি বিশেষ চরিত্র। ককবরক লোককথায় তাকে বীর হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। নির্দেশক এখানে তার চরিত্রের বীরত্বপূর্ণ সরলতার সঙ্গে যে হাস্যরসের মিশেল দিয়েছেন , তা অভিনব। এই চরিত্রে শ্যামল কান্তি দে তাঁর কণ্ঠ  ও  চলনের বিশেষ টাইপ ব্যবহারে চরিত্রটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তবে, সবকিছু ভালোর মধ্যে তাঁর ভুঁড়ির আকারটি যথাযোগ্য হলে আরও ভাল লাগত। । চৌধুরী চরিত্রে পীযুষ কান্তি রায় ও আদিবাসী দলপতি চরিত্রে সৈকত আচার্য চরিত্রানুগ। গুরুদেব ও দূত চরিত্রাভিনেতাদের আরও অনুশীলন প্রয়োজন। নাতি চরিত্রে অরিজিৎ ভট্টাচার্য কিন্তু দাদু বিপ্লব ভট্টাচার্যকে ছাপিয়ে গেছে।  
এমন একটি ইতিহাস নির্ভর কাহিনীকে মঞ্চে সঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে নির্দেশক পার্থ মজুমদার চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখে নি।  আমাদের শহরে প্রাপ্ত সব সেরা বিশেষজ্ঞদের সৃষ্টিকে দিয়ে নাটকটিকে সাজিয়েছেন। তবু, কিছু স্বল্প সময়ের দৃশ্য, কয়েকটি দৃশ্যের অন্তিমে আবহহীন অহেতুক সংলাপের মাইম, টানা বীর রসকে কোন ভাবে ভাঙ্গা, এমন কিছু বিষয়  নিয়ে নির্দেশককে ভাবতে অনুরোধ করবো। নিঃসন্দেহে এ নাটকের সেরা মুহূর্ত শেষের শেষ ঝলকটি যেখানে কামানের পিছনে দুই বীর অস্ত্র নিয়ে দাঁড়ায়। একটি নাটকের পাঁচ ছয়টি অভিনয়ের আগে সেটা কাঙ্খিত মাত্রায় পৌঁছায় না, এ নাটকে নাট্যকার ও নির্দেশক যেহেতু একজন - সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অচিরেই ত্রিপুরার ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল বীরগাথা নিয়ে সুরপঞ্চমের এই  আধুনিক মঞ্চভাষ অভীষ্ট মাত্রায় নিশ্চিত পৌঁছাবে ।