
ড.চন্দন সাহা
সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা একটি সমাজকে শুধু সমৃদ্ধই করে না, তাকে মানবিকতার গভীরতর স্তরেও পৌঁছে দেয়। সেই সাংস্কৃতিক পরম্পরাকে ধারণ করেই গত ১২ জুলাই, ২০২৬ রবিবার সন্ধ্যায় আগরতলার মুক্তধারা অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হলো সৃষ্টি নাট্য সংস্থার নিবেদিত এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান— “মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কবিতার সন্ধ্যা”।
আয়োজকদের আন্তরিক প্রয়াসে সেদিন মুক্তধারা অডিটোরিয়াম যেন পরিণত হয়েছিল কবিতা, আবৃত্তি ও শিল্পসত্তার এক মিলনমেলায়। অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সৃষ্টি নাট্য সংস্থার প্রার্থনা সংগীত “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে”-এর সুরমূর্ছনায়। সেই আধ্যাত্মিক ও নান্দনিক আবহকে নৃত্যের ছন্দে মূর্ত করে তোলেন সংস্থার প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী দেবস্মিতা বিশ্বাস। উদ্বোধনী পর্বের পর সৃষ্টি নাট্য সংস্থার কর্মশালার শিল্পীরা তাঁদের মনোজ্ঞ পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। এরপর অনির্বাণ ঘোষ, জলী দাশগুপ্ত, গৌরদাস দেব প্রমুখ শিল্পীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় এক মননশীল কবিতার কোলাজ, যা দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। পরবর্তী পর্বে শুভাশিস কর ও মনিষা নাথের শ্রুতিনাটক উপস্থিত শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। এই মনোজ্ঞ পরিবেশনাগুলির পর মঞ্চে আবির্ভূত হন সন্ধ্যার মূল আকর্ষণ, বিশিষ্ট আবৃত্তিকার মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীল ও সৌন্দর্যমণ্ডিতভাবে সঞ্চালনা করেন শুভাশিস কর।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন প্রখ্যাত আবৃত্তিকার শ্রীমতী মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কণ্ঠে বাংলা কবিতার বিভিন্ন রূপ ও রস নতুন মাত্রা পায়। শব্দ, উচ্চারণ, আবেগ এবং শিল্পিত উপস্থাপনার অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের এক অনন্য অনুভূতির জগতে নিয়ে যান। কবিতার প্রতিটি পংক্তি তাঁর কণ্ঠে যেন নতুন জীবন লাভ করে, আর সেই জীবনস্পর্শী আবৃত্তি দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরা কালচারাল অ্যাডভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান শ্রী সুব্রত চক্রবর্তী। তিনি তাঁর বক্তব্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে কবিতা মানুষের অনুভূতি, মূল্যবোধ ও মননের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি সৃষ্টি নাট্য সংস্থার এই উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক জলী দাশগুপ্ত তাঁর বক্তব্যে মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শিল্পসাধনার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, একজন শিল্পীর সাফল্যের পেছনে থাকে নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন, নিষ্ঠা ও আত্মনিবেদন। মেধা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সাধনারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
এই সমগ্র অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও সফল বাস্তবায়নের নেপথ্যে ছিলেন বিশিষ্ট সংস্কৃতিপ্রেমী শ্রী গৌরদাস দেব। অনুষ্ঠানটির প্রতিটি পর্বকে সুসংগঠিত ও শিল্পসম্মত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং নিরলস পরিশ্রম বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। উপস্থিত অনেকেই তাঁর সাংস্কৃতিক নিষ্ঠা ও সংগঠকসুলভ দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
সৃষ্টি নাট্য সংস্থার সম্পাদক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে সকল অতিথি, শিল্পী ও দর্শকদের স্বাগত জানান। তিনি বলেন, কবিতা শুধু পাঠের বিষয় নয়; এটি মানুষের অন্তর্জগতের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনের এক অসাধারণ মাধ্যম। সেই উপলব্ধি থেকেই এই বিশেষ কবিতা-সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে।
পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল এক মননশীল ও নান্দনিক আবহ। উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের উৎসাহ, মনোযোগ ও আন্তরিক অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। আয়োজকদের ভাষায়, “আপনাদের উপস্থিতিই আমাদের প্রেরণা”— এই বক্তব্যের যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছিল সেদিনের অনুষ্ঠানমঞ্চে।
একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা কখনও কখনও কেবল বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। মেধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার সন্ধ্যাও তেমনই এক শিল্পসমৃদ্ধ, হৃদয়স্পর্শী এবং স্মরণীয় আয়োজন হিসেবে উপস্থিত সকলের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে থাকবে। সাহিত্য, আবৃত্তি এবং সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন আগামী দিনেও শিল্পমনস্ক মানুষকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে— এমন প্রত্যাশাই রইল।