img

অলকা: মানবিক মূল্যবোধ সংকটের সম্মুখে দাঁড় করায় আমাদের।

অসীম কুমার রায়


সম্মিলিত নাট্য প্রয়াসের ধারা বজায় রেখে ১১ জুলাই ২০২৬, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়- মুক্তধারা আউটোরিয়াম-এ, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সহযোগিতায় মঞ্চস্থ হয়,
নাটকঃ অলকা
গল্পসূত্র: গৌতম দাস (কলিঃ)
নাট্যরূপ: বিভু ভট্টাচার্য্য
নির্দেশনা: মিহির কান্তি ভট্টাচার্য্য
প্রযোজনা: ত্রিপুরা থিয়েটার
 স্বার্থান্বেষী লোভ আর অনেক অর্থ উপার্জনের উচ্চাকাঙ্ক্ষায়- আজ কী কী হারিয়ে গেছে, আর কী অবস্থিত, মূলত সেই নিয়েই এই প্রযোজনা। শুধু অর্থের ধান্দায় বর্তমান যুগের উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা-ইদানীং বেড়ে গেছে অনেকটাই। নিমেষে বিদেশি কালচারে অভ্যস্ত হয়ে; মা-বাবার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অনীহাজনিত কারণে বহু অভিভাবকদের-ই আজ অসহনীয় অসহায় অবস্থা।
অলকা এবং শংকরের একমাত্র সন্তান শানু। স্বামীর একার রোজগার ও অলকার মিলিত প্রচেষ্টায় কষ্ট করেই সযত্নে লালন করে, ছেলেকে শিক্ষিত করেন। বিদেশে চাকরি করতে পাঠায় অ-নে-ক আশায় বুক বেঁধে। আদরের শানু বিয়ে-থা করে স্যটেল্ড হয়ে যায় সেখানেই। এদিকে শংকর অকালে চলে গেলেন,না ফেরার দেশে। দেখে গেলেন না, ছেলের অবিবেচক কদর্য আত্মকেন্দ্রিকতা ও অনির্বচনীয় প্রতারণা। স্বামীর কষ্টার্জিত উপার্জনে সাজানো বাড়িটা বৃদ্ধা অলকা একাকী আগলে রাখছেন, ছেলে শানুর আগমন প্রতিক্ষায়। অষ্টক্ষণ আকূল থাকেন কবে, কখন, ছেলে-বউমা, নাতি-নাতনিকে দেখবেন সেই আশাতে। 
পাশ্চাত্য জীবন বোধে নিমজ্জিত শানু একবার এসেছিল স্বদেশে 'মা' দর্শনে।
তাও আবার একা। উদ্দেশ্য, বাড়ি বিক্রি করে অলকাকে কানাডায় নিয়ে যাবে। সেই মোতাবেক, অগ্রাধিকার-এর ভিত্তিতে তাদেরই বাড়িতে আসা নব্য ভাড়াটিয়াকে বাজার দর থেকে কিছু অল্প দামে বাড়ি কেনার সুযোগ দেয়। শুধুমাত্র সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে- যে স্বপ্নের বাড়িটাকে বুকের পাঁজরের মতো আগলে রেখেছিলেন অলকা, আজ সেই বাড়ির মায়া ত্যাগ করে বুকে পাথর চাপা দিয়ে-ছেলের ইচ্ছা পূরনে অলকা চলে গেলেন শানুর সঙ্গে এয়ারপোর্ট। বয়স্কা গর্ভধারিনী মা ঘন্টার পর ঘন্টা ছেলের অপেক্ষায়। শানু মায়ের সঙ্গে ভাবনাতীত প্রতারণা করে, একা বিদেশে চলে যায়।
পুলিশের নজরে পড়ে অলকা। নাম-ধাম উদ্‌ঘাটনে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার নিজ দায়িত্বে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেন। বুকফাটা আর্তনাদে অলকার সিদ্ধান্ত - তিনি চলে যাবেন, অনেক দূরে এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে। মাতৃ-পিতৃহীন সজ্জন ভাড়াটিয়া ফ্যামিলির আন্তরিক আবদার এবং দরদী প্রতিবেশীদের অনুরোধে, ভগ্নহৃদয় অলকার অন্যত্র গমন-ইচ্ছা বানচাল হয়। নাটকের ইতি ঘটে - বর্তমান সমাজে মনুষত্বহীন, স্বার্থপর মানুষের চেয়ে - পরার্থপর বিবেকবান মানুষের সংখ্যা এখনও বহুগুণ বেশি, সেই ধ্রুব সত্যের দিক নির্দেশে। 
মঞ্চায়ন প্রসঙ্গ:
নাট্যকারের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সময়োপযোগী উপস্থাপন ভাবনায় - দর্শকমনে যে ভাবনার উদ্রেক করেছে, সে বলা বাহুল্য।
'অলকা' চরিচে অভিনেত্রী গায়ত্রী চৌধুরীর অভিব্যক্তি, চলন-বলন, সন্তান স্নেহ, স্বামীর সুখ-দুঃখ, অসহায়তা, যন্ত্রনা, ছেলের অনাকাঙ্খিত প্রতারণা- সবটাই যথার্থভাবে প্রমান করেছেন তিনিই এই নাটকের কান্ডারী। 
ব্যাঙ্ক কর্মচারী কৃষাণু চরিত্রে অভিনেতা শ্যামল কান্তি দে-র বাচন ও বিচরণ এত স্বচ্ছন্দ, এত সাবলীল যে মুগ্ধ হতে হয়।
কৃষাণুর সহধর্মিনীর ভূমিকায় কুশলী অভিনেত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরী স্ব-মহিমায় যা করার একদম তাই করেছেন।
প্রতিবেশী চরিত্রে শেখর সি দত্ত, সজ্জন ব্যক্তি হিসাবে সপ্রতিভ। পুলিশ অফিসার চরিত্রায়নে অভিনেতা দেবব্রত মুখোপাধ্যায় স্বকীয় এবং বেশ মানানসই।
নৃত্যশিক্ষিকা শ্যামলিমা দে অত্যন্ত সুচারুভাবে নিজের জাত চেনালেন। শিক্ষার্থী শিশুশিল্পী রিনিকা সিংহ রায় যে ভবিষ্যতেও মঞ্চ দাপাবে, সেই সরল বার্তা অবলীলায় দিল। নাটকের 'নৃত্য দৃশ্য' ভুলা যাবেনা সহসা।
শানু চারিত্রে অপূর্ব সাহা নির্দেশকের নির্দেশ অমান্য করেননি। তবে, সোফার হাতল চেপে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে বা মুভমেন্ট করে সংলাপ বলার সুপ্ত ইচ্ছেটা যেন বারকয়েক ধরা পড়ল প্রচ্ছন্নভাবে।
 অলকার হাজবেন্ড শংকর চরিত্রে কমল মজুমদার-এর ফ্ল্যাশব্যাক সিকুয়েন্স/দৃশ্য বেশ পরিপুষ্ট ভাবে উপস্থাপিত হয়। যা তাঁর অভিনয়গুনে নাট্যগতিকে এগিয়ে দেয় যথার্থভাবে।
কৃষাণুর অধঃস্তন ব্যাঙ্ককর্মী দিলীপ কুমার রায় স্বল্প পরিসরে পরিচালকের নির্দেশ হুবহু পালন করেছেন।
শিশু শিল্পী রিনিকার মুখনিসৃত সংলাপ-'যারা বিদেশে যায়, তারা কি আর দেশে ফেরে না?' ছোট্ট মুখে এই অনুভূতিপ্রবণ সংলাপ, অধিকাংশ দর্শকদের ললাটের চামড়ায় গভীর কুঞ্চন সৃষ্টি করেছে।
অলকার কেয়ারটেকার চরিত্রে অভিনেত্রী শিল্পী ভট্টাচার্স যখন যেমন-তখন তেমন দায়িত্ব পালনে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। 
নাটক শেষ হয়-অসহায় বৃদ্ধার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও এক সুতোয় গাঁথুনির মাধ্যমে- 'আপন থেকে পর ভাল'- এই নিখাদ সত্যের মনোরম প্রভাতের ঈশারায়।
নেপথ্যে আবহ দাতা সৌম্যেন্দ্র নন্দী এবং রূপসজ্জায় তপন কর্মকার যথোপযুক্ত। আলোক শিল্পী মৃণাল কান্তি ভট্টাচার্য পরিবেশ রচনায় আর একটু বিশ্বস্ত ভূমিকা নিতে পারতেন।বিশেষ করে ভাড়াটিয়ার ঘর থেকে অলকার ঘরে যাতায়াতের দৃশ্যে। রাজেশ কান্তি সাহার মঞ্চ পরিকল্পনা সামগ্রিক ডিজাইনিং-কে সাহায্য করলেও, ভাড়াটের ঘর থেকে অবাধে যাওয়া-আসা বেশ খটকা সৃষ্টি করেছে। এক্ষেত্রে কেউ জুতো খুলে, কেউ বা জুতো পড়ে অলকার ঘরে প্রবেশের ক্ষেত্রেও সামান্য ভাবনার অবকাশ রইল। নতুন ভাড়া বাড়িতে প্রবেশের ক্ষেত্রে-একটা মাত্র ছোট ট্রলি আর বেশকটা টেডিবিয়ার বা বার্বিডল ছাড়া আরও কিছু অনুসঙ্গের চাহিদা সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে নেপথ্যে-জিনিসপত্র নিয়ে এক-দুজন শ্রমিক মজুরের সংলাপ সংযোজন করা যায় কিনা ভেবে দেখার অনুরোধ রইল। ভাড়াটিয়া ঘরের ড্রয়িং রুমে তিনটি কুরসি দৃশ্যমান হয়। এগুলি সেটিং করতে গিয়ে  দেখা গেল, একটা কুরসি প্রায় দ্বার বড়াবড়। বিষয়টা দৃষ্টিনন্দন লাগেনি। 'অলকা' একসময় আলমারির উপর অবস্থিত প্রয়াত স্বামীর ফটোফ্রেমটা স্পর্শের বিশেষ চেষ্টা করেন, তা সত্ত্বেও অপারগ। শেষমেশ বহুকষ্টে নাগালের মধ্যে টেনে আনেন এবং সংলাপ বলেন, প্রশ্ন জাগে, ফ্রেমটি নাগালের বাইরে ছিল কেন, খুব ভাল লাগত, - অলকা যদি সযত্নে ফটোটা নামিয়ে হৃদয়ে চেপে সংলাপগুলি বলতেন। নতুন ভাড়াটিয়া আসবেন বলে ঝাড়পৌঁছ-এ ব্যাস্ত পরিচারিকা। ভাড়াটে ফ্যামেলির সবাই ঘরে ঢুকলেন। পরিচারিকা নির্বিকার,অনেকটা সময় গড়িয়েছে - তারপর নজর দিলেন এবং কথা বললেন। অবাস্তব লাগল। অলকার ফ্যামিলি স্টেটাস অনুসারে, তাঁর ওয়ান-টাইম জলের বোতল থেকে জল খাওয়া মানানসই লাগেনি। ভগ্নহৃদয়ে ছেলে শানুর সঙ্গে চিরতরে বিদেশ চলে যাওয়ার দৃশ্যে-ঘরের বহির্ভাগ অংশে বা সীমানায় গিয়ে বৃদ্ধার ভাবাবেগ তাড়িত স্পর্শানুভূতি, স্বভাবতই দর্শকদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা নয়। অথচ, চলমান নাট্যে সেটাই দৃশ্যমান হল। যা টেকনিক্যালি অযথার্থ। 
ধন্যবাদ ত্রিপুরা থিয়েটারের প্রযোজকবৃন্দকে। এই সময়ে সামাজিক তথা পারিবারিক নীরব যন্ত্রনার দিকগুলো নিয়ে এমন হৃদয়গ্রাহী, চিত্তচাঞ্চল্যকর প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য।