img

নাটক ' কালান্তিকা' আমাদেরকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

নারায়ণ দেব
 নাট্য আলোচনা লিখতে বসলে যদি প্রযোজনাটি নিখুঁত ও সর্বাঙ্গসুন্দর হয়, তখন কেন ভাল লেগেছে তা বোঝাতে গিয়ে বিশেষণের বা  সুপারলেটিভস এর অভাব ঘটে যায়। হয়তো সে ক্ষেত্রে ইংরেজিতে একটা দারুন শব্দ আছে supercalifragifragilasticexpialidocious তা ব্যবহার করলেই মিটে যায়! রসিকতা ছেড়ে আসল কথা হল, সম্মিলিত নাট্য প্রয়াসের উদ্যোগে ৭ আগস্ট,২০২৬ আগরতলার মুক্তধারা প্রেক্ষাগৃহে নাট্যভূমি গ্রুপ থিয়েটারের পার্থ প্রতিম আচার্যের লেখা তাঁরই নির্মাণে ' কালান্তিকা' নাট্যটির আলোচনা লিখতে বসে এমনই মনে হল। এতটা নিখুঁত,  এতটা সুচারু প্রযোজনা খুব কমই নজরে পড়ে। প্রযোজনার সব কটি বিভাগ এতটা যত্ন নিয়ে সম্পাদিত যে, ইংরেজির ওই চৌত্রিশটি অক্ষরের প্রশংসাসূচক শব্দটিই মনে আসে।
  প্রথমে আসা যাক পার্থ প্রতিম আচার্য রচিত, নির্দেশিত, সহকারী নির্দেশনা: শুভ্রজিৎ পাল এবং মধুমিতা নাথ সম্পাদিত নাটকটির আলোচনাতে। নাটকের কেন্দ্রে রয়েছেন এক বিদূষী নারী কালান্তিকা। যিনি চতুর্বেদী, আয়ুর্বেদাচার্য ও নৈয়ায়িক। ঘটনাকাল বৈদিক যুগ। সে যুগে ভারতীয় নারীকে দেখা হত প্রধানত: অশুচি, স্বভাবত পাপিষ্ঠা এবং অমঙ্গলের হেতুরূপে। নারীর প্রধান স্থান সে হচ্ছে পুত্রের জননী ও ভোগ্যা বস্তু। গাভী, স্বর্ণ, অশ্ব ও গজের সঙ্গে সে ও যজ্ঞের দক্ষিণা হত। মন্ত্রোচ্চারণ ও হবিদানের অধিকার  ছিল না নারীর। বিশিষ্ট ধর্মসূত্রেঃ  নারী কুমারী অবস্থায় পিতার অধীন, যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে পুত্র। নারী স্বাধীনতা লাভের যোগ্য ছিল না।   জন্মসূত্রে নারী বলেই জ্ঞান ও অধিকার স্বীকৃতির পথে কালান্তিকাকে বারবার মুখোমুখি হতে হয় অদৃশ্য প্রাচীরের। ফলে সে বেছে নেয় তন্ত্র সাধনার পথ। সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে সে পায় তাঁর আকাঙ্খিত ক্ষমতা। কিন্তু  একটা নির্দিষ্ট সময়ের গন্ডিতে সে বাঁধা পড়ে।  সময়ের মধ্যে তাকে সব কিছু করতে হবে। সে তাঁর ক্ষমতার চূড়ান্ত ব্যবহার করে।  রাজাকে শিখন্ডী বানিয়ে  শাসন ভার তুলে নেয় নিজের হাতে। নিজেকে ঈশ্বরী হিসাবে ঘোষনা দেয়। অবশেষে যখন তাঁর ক্ষমতার সময় শেষ হয়ে যায়, যখন সে প্রেম ভিক্ষা করে তখন সে প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রত্যাখ্যান, অপমান, এবং আত্মমর্যাদার গভীর ক্ষত তাঁকে এমন এক অভিযাত্রার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে জ্ঞান, ক্ষমতা, বিশ্বাস, প্রেম এবং শূন্যতার অর্থ ক্রমশ নতুন রূপে উদ্ভাসিত হয়। কালান্তিকা অসীমে মিলিয়ে যাওয়ার আগে বলে যেখানে দেব, যক্ষ, রক্ষ নেই সেখানে যেতে চাই।  
প্রতীকী নাট্য কাহিনী আমাদের কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জ্ঞান কি মানুষকে মুক্ত করে, নাকি আরও গভীর বন্ধনের দিকে নিয়ে যায? ক্ষমতা কি আত্ম মর্যাদার পুনরূদ্ধার নাকি আত্মবিনাশের সূচনা? তথাকথিত সমাজ  যে পবিত্রতার যে ধারনা নির্মাণ করে ,  তার সীমারেখা কোথায়? আর সত্যিকারের মুক্তি কি বাহ্য জগতে, না কি মানুষের অন্তরেই নিহিত?
  ক্রিস্টোফার মার্লোর বিখ্যাত ক্লাসিক ডক্টর ফস্টাসের অনুপ্রেরণায় রচিত এই নাটকটি দর্শকের সামনে একটি জোরালো বার্তা দেয়। এই  একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে ও নারীরা  প্রকৃত স্বাধীন ও সমানাধিকার ভোগ করেন? নিশ্চিত পক্ষেই না। আইনগত ভাবে স্বাধীন ও সমানাধিকারের কথা বলা থাকলেও বাস্তবে সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা এখনও বহুলাংশে পিতৃতন্ত্র ও সামাজিক প্রথার উপর নির্ভরশীল। আইন আর বাস্তবতার মধ্যে নারী স্বাধীনতার চিত্রটি দ্বি-মুখী। 
একটি প্রতীকী নাট্যভাষা কি করে মঞ্চে দৃশ্যায়িত করা যায় তার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল এই প্রযোজনাটি।
 পুরো নাট্য জুড়ে পার্থপ্রতিম নিখুঁত ভাবে দৃশ্যগুলিকে উপস্থাপন করেন। একটা বিশাল ক্যানভাস জুড়ে এক সংগঠিত ও ডিসিপ্লিনড কাজ। নানা সুন্দর- সুন্দর ফর্মেশন এবং নাট্য মুহুর্ত নাটক দেখাটাকে মনোরমতা দেয়। তবে নাটকের দৃশ্যান্তরের সময়সীমাটাকে একটু সংক্ষিপ্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আরও একটি কথা না বললেই নয়, নাটকের শেষ মুহুর্ত, কুশিলবেরা তাদের মুখোশ গুলি খুলে রাখলেন রোস্টাম্পের নিচের তাকে এবং সেখানে আলো পড়ল। তাতে করে এই ঝড়া সময়ের মুখোশের আড়ালে মুখগুলির কথা মনে পড়ল। 
  নন্দী ব্রাদার্স (সৌম্যজিৎ ও শুভ্রজিৎ) এর আবহ সঙ্গীত রচনা নাটকের যে নিজস্ব চলন, তার সঙ্গে homogeneous করে বিভিন্ন crescendo নাট্য মুহুর্তগুলিকে মূর্ত করে তোলে। প্রদীপ দাসের আলোক পরিকল্পনায় নাটকের ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে। 
শুভ্রজিৎ পালের মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিল পরিণতির ছাপ। অপ্রোদিতির নাটকের পোষাক পরিকল্পনা লক্ষণীয়। প্রতিটি চরিত্রের পোষাকের ব্যবহার বিষ্ময় জাগায়। পোষাকের আতিশয্যে চরিত্ররা হারিয়ে যায়নি।  রূপসাজ সুচারু ভাবে সম্পন্ন করেছেন পীযূষ কান্তি রায়। শব্দ প্রক্ষেপনে ছিলেন শিশির কান্তি কর। প্রথম দিকে কিছুটা লো ভলিউম থাকলেও ক্রমে তা সঠিক ভাবে প্রয়োগ হয়। অলকেশ দেবনাথের প্রজেক্টরের কাজ ছিল যথাযথ।
  অভিনয়ে মধুমিতা নাথ এক অদম্য এনার্জি নিয়ে কালান্তিকাকে দর্শকের সামনে উপস্থিত করলেন। তাঁর স্পষ্ট সংলাপ উচ্চারণ এবং নিখুঁত স্বরক্ষেপে এবং যুক্তিগ্রাহ্য intonation-এ প্রক্ষেপণ, অভিব্যক্তি প্রকাশে সংলাপের Between the lines-এর অর্থকে প্রকাশ করা, মঞ্চ পরিসরের ব্যবহার চমৎকৃত করে দর্শক শ্রোতাদের। কর্ণপিশাচিনির চরিত্রে মায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছে অপ্রোদিতি। তাঁর সংলাপ প্রক্ষেপণ, অভ্যিবক্তি প্রকাশ, মঞ্চ ব্যবহারে ছিল না কোনও জড়তা। যেমন ছিল না জগদীশ/ রিপু চরিত্রে তৃষাণের কাজে, বা কামদেব/ ভাঁর / রিপু চরিত্রে সরজিৎ দেবের কাজে। গুরু বশিষ্ঠানন্দ/ সেনাপতি/ রিপু এই তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুমন মজুমদার। গুরু বৈশিষ্ঠানন্দের চরিত্র তাঁর কন্ঠস্বরের আরও variation দাবি করে। মহারাজ চরিত্রে বিক্রম রায় চৌধুরী অত্যন্ত সমৃদ্ধ অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন।এ ছাড়া সুত্রধার/ রিপু/ রতিদেবী / রাজ লিপি কার ( পূনম সরকার), মহাপ্রেতপতি/ ধর্মাধ্যক্ষ (অর্ক দেব), পটচিত্রকর/ রিপু ( সুস্মিতা পাল), প্রহরী/ রিপু ( শুভ্রজিৎ পাল) ডোম  প্রভাত রুদ্রপাল ও দিলীপ সাহ) প্রত্যেকেই নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের কাজগুলি সমাধা করেছেন, এবং নির্দেশকের সুসঙ্গত ছক মেনেই।
 পরিশেষে,  বলতে হয় পার্থর কাজটি অবশ্যই এক সাহসী কাজ; এবং নাট্যভূমি গ্রুপ থিয়েটার- কে সাধুবাদ জানাতেই হয় এমন পরীক্ষামূলক কাজ যা আজ মঞ্চে খুব প্রয়োজন, তা দর্শকের সামনে এনে দেওয়ার জন্য।