
ডাঃ অন্তিম শীল
এক বন্ধুর পরামর্শে এই সিনেমাটি দেখলাম। অনেকদিন ধরে এটা নেটফ্লিক্সে নং ১ ট্রেন্ড করেছে। পরিচালক লুইস লেটেরে আগে যে সিনেমাগুলো করেছে তাদের মধ্যে যেমন দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক, ক্ল্যাশ অফ দ্য টাইটানস, নাউ ইউ সি মি, ফাস্ট এক্স ইত্যাদি। লুইস লেটেরে বেশিরভাগ অ্যাকশন ধর্মীই সিনেমা ডিরেক্ট করতে দেখা যায়। দ্য লাস্ট হাউস- সিনেমাটিও অনেকটা অ্যাকশন ঘরানার, সায়েন্স ফিকশন ও হরর জোনের সিনেমা।
গল্প বলতে:- জেসন ও তার পরিবার এক বৃষ্টিভেজা দিনে হঠাৎ দেখতে পায় যে তাদের বাড়ির দরজা-জানালা সব বন্ধ হয়ে গেছে। বাইরে যাওয়া অসম্ভব, ফোন-ইন্টারনেটও কাজ করছে না। শত চেষ্টা করেও দরজা-জানালা খুলতে পারছে না। আসেপাশের সবাই যার যার ঘরে বন্দি হয়ে আছে, কেউ বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। জেসন জানালা, দেয়াল এবং মেঝে ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু বৃষ্টির জল এমন একটি বাধা তৈরি করেছে যা সব দিক থেকে তাদের ঘর থেকে বের হওয়া আটকে দিচ্ছে। এক দিন দুই দিন করতে করতে এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ শেষ হয়ে এক মাস, দুই মাস চলে যেতে থাকে, ঘর থেকে কেউ বের হতে পারে না। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, অ্যান (জেসনের স্ত্রী) একটি ইনডোর সবজি বাগান নিয়ে কাজ করে এবং জেসন একটি পানীয় জল ফিরিয়ে আনার পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা তৈরি করে। জেসনর মেয়ে রুথ মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে বাইরে কিছু একটা দেখতে পাচ্ছিল। তা কি কোনো প্রাণী না কোনো এলিয়েন কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু যখন সে এটা তার পরিবারকে বলে, তারা প্রথমে এটা শুধু তার কল্পনা হিসেবে উড়িয়ে দেয়। ৪৯ মিনিটে আস্তে আস্তে সেই প্রাণী বা এলিয়েনের হালকা দেখা হয়। তবে এমন কিছু বোঝা যায় না।
এমনভাবে চলতে চলতে ৫ বছর সম্পূর্ণ হয়ে যায়। আশেপাশে আর কেউ বেঁচে ছিল না, কেউ খাদ্যের অভাবে আবার কেউ বৃষ্টির জলে ডুবে মারা যায়। জেসনের পরিবারও খুব ভালো অবস্থায় ছিল না। অবশেষে জেসন ও তার পরিবারের সবাই মিলে এই ক্রিয়েচার বা এলিয়েনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এতো দিন ঘর থেকে বের না হয়েও জেসন আর পরিবার কীকরে বেঁচে থাকলো? ক্রিয়েচার বা এলিয়েন সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারলো জেসন ও তার পরিবার? না, অন্যদের মতো তারাও রক্ষা পায়নি? এজন্য নেটফ্লিক্সে রিলিজ হওয়া ১ ঘণ্টা ৫২ মিনিটের এই সিনেমাটা অবশ্যই দেখতে হবে।
ভালো দিক :- দ্য লাস্ট হাউস একটি মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, যেখানে ভয়ের উৎস হলো নিজের বাড়ির ভেতরেই আটকে পড়া। আর বাইরে রহস্যময় এক বিপর্যয়ের কারণে পৃথিবীর স্বাভাবিক যোগাযোগ ও ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে থাকা। সিনেমার শুরুটা দর্শকদের টেনে রাখে। এটি COVID-19-এর সময় ঘরে বন্দি থাকার অনুভূতি মনে করিয়ে দেয়। ওয়াগনার মুরা (জেসন) এবং গ্রেটা লি (অ্যান) অনেক ভালো অভিনয় করেছে। দুজনেই চরিত্রগুলোর আতঙ্ক, হতাশা এবং পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ওয়াগনার মুরা-র চরিত্রটি একজন বাবার দায়িত্ব এবং অসহায়ত্ব—দুটোকেই একসঙ্গে তুলে ধরে। এটি প্রতিদিন বেঁচে থাকার কষ্ট দেখায়। খাবারের জন্য লড়াই করা এবং বাচ্চাদের স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে থাকার কষ্টও দেখানো হয়েছে। বারবার পরিবারের ধৈর্য ও সাহসের পরীক্ষা হয়। জেসন ও তার পরিবার তারা বাইরে যেতে পারে না, কারণ একটি অদৃশ্য শক্তি তাদের ঘরের ভিতরে আটকে রাখে। এতে গল্পে অনেক ভয় ও উত্তেজনা তৈরি হয়। সিনেমাটি বোঝাতে চায় যে মানুষ নিজেরাই পৃথিবীর ক্ষতি করছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করছে ইয়ায়ের এলাজার গ্লটম্যান এবং এটি সিনেমার উত্তেজনা আরও বেশি অনুভূত করায়। সিনেমার চিত্রগ্রহণ এবং সম্পাদনার কাজ ও অনেক ভালো।
খারাপ দিক :- সেকেন্ড হাফে আস্তে আস্তে সিনেমাটা ট্র্যাক হারিয়ে ফেলে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সিনেমার ভাবনা ভালো হলেও বাস্তবায়ন সবসময় ততটা ভালো লাগে না। দর্শক যখন রহস্য নিয়ে আরও কিছু আশা করেন, তখন কিছু জায়গায় সিনেমাটা হতাশ করে। VFX ভালো হলেও কিছু জায়গায় একটু artificial লেগেছে। ভাবনা ভালো হলেও গল্পটা সবসময় সেই টানটান উত্তেজনার ব্যাপারটা ধরে রাখতে পারে না। কিছু জায়গায় গল্প ধীর হয়ে যায়, আর mystery-র explanation-ও খুব একটা সন্তোষজনক লাগে না। হঠাৎ পাঁচ বছর পর গল্প আবার এগিয়ে যায়। কিন্তু এই পাঁচ বছরে তাদের কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে, সেটা খুব একটা দেখানো হয়নি। আমরা শুধু দেখি জেসনের বাচ্চাগুলো তারা বড় হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা বা আচরণে কী পরিবর্তন এসেছে, সেটা ঠিকভাবে বোঝা যায় না।
তবুও, দ্য লাস্ট হাউস একবার দেখার মতো সিনেমা। এর ভাবনা ভালো, আর অভিনেতা-দের অভিনয়ও ভালো। বাড়ির পরিবেশটাও বেশ ভালোভাবে দেখানো হয়েছে। আর আবহসংগীত এবং sound design-ও ভালো। বিশেষ করে বাড়ির ভেতরের চুপচাপ পরিবেশটা অনেক সময় বেশ ভয় লাগায়। সিনেমাটা শুরুতে যতটা আশা তৈরি করে,শেষে পুরোপুরি সেটা পূরণ করতে পারে না। তবে সিনেমাটি দর্শকের মনে একটা প্রশ্ন তৈরি করে: “আমি যদি এই বাড়ির ভেতরে আটকে পড়তাম, কতদিন টিকে থাকতে পারতাম?”