
আলোচনায় মনোজ দেবরায়
নাটক: উইপোকা
রচনা : রাজু মোদক
নির্দেশনা: অতনু চন্দ
প্রযোজনা: কথা
গত ৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ আগরতলা মুক্তধারা অডিটরিয়ামে মঞ্চস্থ হলো "কথা" প্রযোজিত নাটক 'উইপোকা'। রচয়িতা রাজু মোদক ও নির্দেশনায় অতনু চন্দ । চিকিৎসা বিজ্ঞানে ডাক্তারদের পাস- আউটের প্রাক মুহূর্তে ঐতিহ্যগতভাবে একটি নৈতিক শপথ বাক্য পাঠ করানো হয় বা শপথ গ্রহণ করতে হয়। আক্ষরিক অর্থে তাকে হিপোক্রেটিক শপথ বা চিকিৎসকের শপথ বলা হয় যার মূল কথা হলো :
*রোগীর কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা ।
*জেনে শুনে কারো ক্ষতি না করা ।
*জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রাজনৈতিক রং ছাড়াই সব মানুষের চিকিৎসা-বিজ্ঞানের সুযোগ দেওয়া ।
*চিকিৎসা বিদ্যার সম্মান ও নৈতিকতা বজায় রাখা। মুক্ত সমাজের কল্যাণের জন্য এই শপথ।
হিপোক্রেটিক ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন বিখ্যাত চিকিৎসক, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তিনি খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৪৬০ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই চিকিৎসার নীতি হিসেবে চিকিৎসকদের এই শপথকে গ্রহণ করেছে যাকে হিপোক্রেটিক ওথ বলা হয়। সামাজকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে এই মহৎ প্রফেশানের শপথ বাক্যটি পাঠ করানো হয়, শুধুমাত্র নিয়ম রক্ষার জন্য নয়, আন্তরিকভাবে এই শপথের প্রতি দায়বদ্ধতা তথা নৈতিক ভাবে ও সংবেদনশীল মনে এটা পালন করার জন্য।
প্রশ্ন হল ধান ভানতে শিবের গীত কেন! আমরা ব্যস্ত সমস্ত সামাজিক জীব বা মানুষ। অত ভাবনার সময় কোথায়, এমনিতেই নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তারপর আবার বাড়তি ভাবনা । কারণ এমন একটি মহৎ কর্মে নিয়োজিত থেকে যদি তার পুঙ্খানুপুঙ্খ অঙ্গীকার বাস্তব ক্ষেত্রে মানতে না পারে তবে সমাজের সাধারণ তথা প্রান্তিক মানুষ সেই সেবা তাদের কাছ থেকে পাবে না এবং মানুষের বিশ্বাসও তার কাছ থেকে উঠে যাবে যার ফলে সমাজে অনৈতিকতার কাজে আসক্ত হতে পারে, অপরাধের সৃষ্টি হতে পারে, অপরাধবোধ জন্মাতে পারে।
আজকের নাটকটির নাম 'উইপোকা' যার প্রতিশব্দ বল্মিক। খুবই ক্ষুদ্র অথচ ধ্বংসাত্মক পোকা। ওরা দলবদ্ধ হয়ে বাস করে, ওরা যখন তার খাদ্য সংগ্রহ করে তখন বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না হঠাৎ করে যখন এই ক্ষুদ্র কিটটার উপস্থিতি অনুভব করা যায় তখন আর কিছুই করার থাকেনা, ভেতর থেকে খোকলা করে দেয়, আমাদের সমাজেও উইপোকা তথা উইপোকা রূপী কিছু মানুষ ভেতর থেকে প্রতিনিয়ত কুঁকড়ে খেয়ে নিচ্ছে যার ফলে সামাজিক অবক্ষয় পরিলক্ষিত হয়।
আজকের নাটকটা ছিল একটু ব্যতিক্রমধর্মী, যা সচরাচর হয় না, এটি একটি গোয়েন্দা গল্প। একজন ডাক্তার হঠাৎ করে খুন হয়ে যান, এই খুনের কিনারা করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার তদন্তের স্বার্থে গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মুখার্জির শরণাপন্ন হন যিনি আগে অনেক কঠিন অপরাধীকে খুঁজে বার করেছেন। যদিও পুলিশ আধিকারিক নিজেও অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু তারা তার সুরাহা করতে পারেননি, শুধুমাত্র দুজনকে আটক করছে সন্দেহবশে । কিন্তু জেরায় কেউই অপরাধ স্বীকার করেননি। প্রফেসর মুখার্জি তাই প্রথমে খুনের মোটিভ কী জানতে চান, কিন্তু পুলিশ এ প্রসঙ্গে কিছুই বলতে পারেনি, তবে দুজনের মধ্যে একজন প্রায় সবসময়ই মানসিকভাবে খুব ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে কেননা অল্প কিছুদিন আগে তার সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। প্রফেসর মুখার্জী তখন অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষা অনুযায়ী তদন্ত করে সেই খুনিকে ধরে ফেলে । আসলে তার ছেলের মৃত্যুর দিন ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেই ডাক্তারবাবু কোন ওছিলায় তাকে হাসপাতালে না রেখে এবং কোন গুরুত্ব না দিয়ে তথা চিকিৎসা না করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় । তারপরেই তার মৃত্যু হয় সেই ডাক্তার ছিলেন খুন হয়ে যাওয়া ডাক্তার প্রীতম। প্রফেসর মুখার্জি ঘটনাটা বুঝতে পারে। সেই অসহায় পিতা রণবীর এই ঘটনায় তার দৃষ্টিভঙ্গিটাই পাল্টে যায় সবকিছুই তার কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। কখন সে নিজের কৃতকর্মের স্বপক্ষে নিজের মতো করে আলাদা এক জগত সৃষ্টি করে সেই মনোজগতে মানসিকভাবে নিঃস্ব হয়ে জিঘাংসা ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং সেই ডাক্তারকে খুন করে এই ছিল নাটকের মূল গল্প।
সুদীর্ঘকাল পর আগরতলায় কোন নাট্যমঞ্চে এ ধরনের গোয়েন্দা গল্পের উপর একটা নাটক মঞ্চায়িত হল যার রচয়িতা রাজু মোদক, সত্যি খুব প্রশংসনীয় উদ্যোগ। চেতনায় সমৃদ্ধ এবং এক ব্যতিক্রমধর্মী নাটক গল্পের বুনন খুবই মসৃণ, কাঠামোও বেশ মজবুত , এক কথায় মঞ্চ সফল নাটকের অনুসারী গল্প। তারপরও আরও একটু দেখে নেওয়া ভালো। যেমন যে ফিতেটা দিয়ে খুনটা করা হলো তার মধ্যে যে তেল বা কেমিক্যাল ব্যবহার হয়েছিল, দ্বিতীয়তঃ নীল গারো রঙের বা অতিবেগুনি রশ্মির কথা বলা হয়েছে তা অপরাধ বিশেষজ্ঞদের বা বিজ্ঞানীদের কাছে যতটা সহজসাধ্য হবে সাধারণ দর্শকদের আছে কিন্তু বুঝতে সহজ নাও হতে পারে তাই এই দিকগুলি একটু ভেবে দেখলে নাট্য দর্শকদের কাছে আরেকটু সহজবোধ্য হবে। তবে পাশাপাশি এ দুটো বিষয়ের যথার্থতা অনুসন্ধিৎসু দর্শক বা অপরাধ বিজ্ঞানে যেন যৌক্তিকতা থাকে অর্থাৎ যুক্তিনির্ভর ও সঠিক হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আগামী দিনে এ ধরনের আরও নাটক আশা করব।
এবার আসি অভিনয়ের দিকে , পুলিশ অফিসারের চরিত্রে ছিলেন আশীষ বিশ্বাস যথেষ্ট সাবলীল সচ্ছন্দ , সংলাপ প্রক্ষেপণ ও মঞ্চ পদচারণায় দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু চরিত্রটার আরো গভীরে ঢুকতে পারলে আরো ভালো হতো। বর্তমান পুলিশ অফিসার কিন্তু অনেক ডিপ্লোম্যাটিক বা চোখের ভাষায় কথা বলে যা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অপরাধীর উপরে ক্রিয়া করে এদিকে আরও একটু খেয়াল রাখলে আগামী দিনে আরো সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত হবে বলে মনে হয়। জয়িতা চরিত্রে রূপা সাহা সঠিকভাবেই প্রফেসর মুখার্জির সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছেন। তবে যান্ত্রিকতা ভাবটা পরিহার করা দরকার ছিল । মা চরিত্রে সুপর্ণা দেবনাথ একটা বড় চমক, দারুণ অভিনয় প্রকৃত অর্থেই সদ্য সন্তান হারা মায়ের আর্তনাদ সবার হৃদয়েই অনুরণন ঘটিয়েছে। খুব ভালো, আগামী দিনের এক সম্ভাবনাময় অভিনেত্রী। রণবীর চরিত্রে রাজু মোদক সংক্ষিপ্ত সংলাপের পরিসরে যেভাবে চরিত্রের অন্তর্নিহিত ভাব ফুটিয়ে তুলেছে তাতে অভিনয়ের গভীরতা ধরা পড়ে। খুব ভালো অভিনয়। মডিউলেশন এবং স্বর প্রক্ষেপণ চমৎকার ।
প্রফেসর মুখার্জির অভিনয় করেছে অতনু চন্দ, ভালো অভিনয় আন্তরিকতাপূর্ণ তবে আরও প্রাণবন্ত হলে ভালো হতো , অনেক সময় মনে হয়েছে চরিত্রটা ওভারলোডেড হয়ে গেছে, তার উপর ছিল নির্দেশনার দায়িত্ব । তবে অভিনয়ের খুঁটিনাটি দিকগুলি আরো একটু ঝালিয়ে নিতে পারলে ভালো । নির্দেশনার দিকে কিছু একটা মিসিং ছিল বলে মনে হলো, পুরো মঞ্চ নিয়ে অভিনয় অর্থাৎ সংলাপ নির্ভর অভিনয়ে মঞ্চটাকে আরও সুচারুরূপে ব্যবহার করাটা একটু কঠিন বটে, তবে অসম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে এটি প্রথম অভিনয়, তা ছাড়া একটু অন্য ধরনের অভিনয়। যতদুর মনে পড়ে অন্তত উনিশ বিশ বছর আগে পুরানো রবীন্দ্র ভবনে, কোলকাতা থেকে "নান্দিমুখ"একটা গোয়েন্দা গল্পের নাটক করেছিল,যাতে বিখ্যাত অভিনেতা বিমল চক্রবর্তীও ছিলেন। এরপর এ ধরনের কোনো নাটক দেখিনি। যাক, আগামী মঞ্চায়নে অবশ্যই আরো সমৃদ্ধ হবে আশা করি। অন্যান্য চরিত্রে যারা রূপদান করেছেন গৌরদাস দেব, সুমন সাহা, জয়ন্ত দেবনাথ, শুভ্রজিত চৌধুরী ও অরিন্দম চক্রবর্তী, স্ব স্ব ক্ষেত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নাটকটিকে গতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছে।
মঞ্চ নির্মাণ করেছেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ মঞ্চশিল্পী দীপঙ্কর বর্ধন রায়। অনেকদিন পর মঞ্চে পেলাম ,দারুন মঞ্চ। আলোতে ছিলেন ত্রিপুরার একমাত্র মহিলা আলোকশিল্পী সীমা দাস, যথেষ্ট সম্ভাবনাময়ী আলোকশিল্পী, যার আলোর ছোঁয়ায় নান্দনিকতার ছোয়া অনুভূত হয়েছে। আবহে ছিলেন সৌমেন্দ্র নন্দী, প্রয়োজন ভিত্তিক যান্ত্রানুসঙ্গ ব্যবহার করেছে । শব্দে শিশির কর ব্যালেন্স মেইনটেইন করতে চেষ্টা করেছে। রূপসজ্জায় ছিলেন রূপা নন্দী, খুব ভালো হয়েছে বলতে পারলে ভালো লাগতো। ধন্যবাদ কথা নাট্যগোষ্ঠীকে এমন একটি নতুন নাট্য ভাবনা এবং সংবেদনশীল নাটক উপস্থাপন করার জন্য। আশা করি আগামী দিনে আরো বেশি করে এ ধরনের নাটক মঞ্চায়িত হবে।