
ডাঃ অন্তিম শীল
কাতুকুতু বুড়ো :- বাংলা সিনেমায় একটু অন্যরকম কিছু দেখার অপেক্ষায় থাকলে Katukutu Buro আপনার নজর কাড়তে পারে। লেখক, পরিচালক ও অভিনেতা উজান গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতেই গতানুগতিক গল্পের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে। মানসিক কষ্ট, সুপারহিরোর জগৎ এবং সমাজের নানা সমস্যাকে একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই ভিন্নধর্মী সিনেমা। উজান গঙ্গোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সিনেমাটি মূলত তরুণ প্রজন্মকে মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে।
গল্প বলতে :— Katukutu Buro-র মূল চরিত্র কেদার বরুয়া। কেদার খুব চুপচাপ স্বভাবের এক তরুণ। ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া কিছু খারাপ ঘটনা তার মনে গভীর দাগ তৈরি করে। বড় হওয়ার পরও সেই কষ্ট তার কাজ, সম্পর্ক এবং আচরণকে প্রভাবিত করতে থাকে।
মা ছাড়া অন্য কেউ কেদারকে ছুঁলে সেটা সহ্য করতে পারে না। ছোটবেলা থেকে তার মনে জমতে থাকা ভয়, কষ্ট আর ঘৃণা ধীরে ধীরে এক গভীর আক্রোশে পরিণত হয়। সেই কষ্ট থেকেই তার মধ্যে তৈরি হয় আরেকটি সত্তা—K2। মুখোশ পরা K2 সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের মতো করে লড়াই শুরু করে। যেখানে অন্যায়ের ঠিকমতো বিচার হয় না, সেখানে K2 নিজেই অপরাধীদের শাস্তি দিতে থাকে।
কাজের সূত্রে কেদারের সঙ্গে পারমিতার পরিচয় হয়। পারমিতার জীবনও খুব সহজ নয়। বাড়িতে তার মা-বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব তার কাঁধে। ধীরে ধীরে কেদার ও পারমিতার মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। এই সম্পর্ক কেদারের জীবনে কিছুটা স্বাভাবিকতা এবং আবেগ নিয়ে আসে।
কিন্তু কেদারের অতীত তাকে বারবার তাড়া করে। তার পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা পুরনো কষ্ট ও রাগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর K2 একের পর এক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শুরু করে এবং নিজের মতো করে প্রতিশোধ নিতে থাকে। অন্যদিকে, পুলিশও K2-এর কর্মকাণ্ডের তদন্ত শুরু করে এবং ধীরে ধীরে কেদারের দিকেও সন্দেহের আঙুল উঠতে থাকে।
এভাবেই কেদারের স্বাভাবিক জীবন আর K2-এর পরিচয়—দুটো দিক ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কেদার কি নিজের অতীতের কষ্ট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, নাকি K2-ই তার জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে—সেটাই গল্পের মূল বিষয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের সন্দেহ আরও বাড়তে থাকে এবং তারা কেদারকে গ্রেফতার করে। কিন্তু তখন প্রশ্ন ওঠে—K2 কোথায় গেল? কেদার আর K2 কি আসলে একই মানুষ? আর পুলিশই বা কেন কেদারকে গ্রেফতার করল? সিনেমাটি অবশ্যই দেখবেন। ২ ঘণ্টা ৬ মিনিটের এই সিনেমাটি এখন হৈচৈ ওটিটিতে- তে দেখা যাচ্ছে।
ভালো দিক :- লেখক, পরিচালক ও অভিনেতা উজান গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতেই গতানুগতিক গল্পের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে। সাধারণ বাণিজ্যিক গল্পের পথে না হেঁটে আবেগ, মানসিক কষ্ট এবং সুপারহিরোর ভাবনাকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি অন্যরকম বাংলা সিনেমা তৈরি করেছে। অভিনয় ও পরিচালনা—দুটো একসঙ্গে সামলানো সহজ নয়, তবে উজান দুটো কাজই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করেছে। নতুন কিছু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার এই সাহসটাই সিনেমাটির অন্যতম ভালো দিক।
প্রধান চরিত্রে উজানের অভিনয় বেশ ভালো লেগেছে। কেদারের ভয়, দুর্বলতা এবং মনের কষ্ট তিনি স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। পর্দায় তাঁর উপস্থিতিও ভালো। রাপূর্না ভট্টাচার্যের অভিনয়ও ভালো লেগেছে এবং উজানের সঙ্গে তাঁর রসায়ন বেশ স্বাভাবিক। কম সময়ের জন্য পর্দায় থাকলেও চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় নজর কেড়েছে। পুলিশ চরিত্রে অনুজয় চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ও প্রশংসার যোগ্য।
সঙ্গীতের দিক থেকে BBD Bagh, Lovuduvu এবং Buro Buri গানগুলো ভালো লেগেছে। দেবায়ন ব্যানার্জি ও উজান গঙ্গোপাধ্যায়ের তৈরি সঙ্গীতে নতুন ও পুরোনো গানের মিশ্রণ বেশ ভালো হয়েছে। তবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আমার তেমন একটা ভালো লাগেনি।
সুপারহিরোর পোশাকটিও বেশ আকর্ষণীয়। এই পোশাক K2 চরিত্রটিকে আলাদা একটা পরিচয় দিয়েছে। ক্যামেরার কাজও ভালো হয়েছে। শুভঙ্কর ভাড় (ISC) সিনেমার দৃশ্যগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। সেট, সাউন্ড এবং অন্যান্য টেকনিক্যাল কাজও বেশ যত্ন নিয়ে করা হয়েছে। সব মিলিয়ে টেকনিক্যাল দিক থেকে Katukutu Buro বেশ ভালোভাবে তৈরি একটি সিনেমা।
খারাপ দিক :- সিনেমায় একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে—সুপারহিরো, থ্রিলার, প্রতিশোধ এবং সামাজিক সমস্যা। ফলে গল্পের কোনো একটি দিককে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়নি। কিছু পার্শ্বচরিত্রকেও শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও পরে তাদের সেভাবে ব্যবহার করা হয়নি।
কেদারের অতীত ও মানসিক কষ্ট গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই বিষয়টি আরও গভীরভাবে দেখানো হলে চরিত্রটির সঙ্গে দর্শকের যোগাযোগ আরও ভালো হতে পারত। একইভাবে, কেদার ও পারমিতার সম্পর্কের দিকটিও আরও কিছুটা সময় পেলে ভালো লাগত।
সুপারহিরো সিনেমা হিসেবে অ্যাকশনের পরিমাণ কিছুটা কম। যে কয়েকটি অ্যাকশন দৃশ্য রয়েছে, সেগুলোও আরও ভালোভাবে তৈরি করা যেত। ভিলেনদের উপস্থিতিও খুব একটা শক্তিশালী নয়। তাদের নিয়ে যে টেনশন তৈরি হওয়ার কথা, সেটা অনেক জায়গায় অনুভব করা যায়নি। অনেক সময় মনে হয়েছে, তারা খুব সহজেই হিরোর সামনে আত্মসমর্পণ করে দিচ্ছে।
কেদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল—কেউ তাকে ছুঁলে তার দম বন্ধ হয়ে আসত এবং সে অসুবিধা বোধ করত। কিন্তু সিনেমা যত এগিয়েছে, এই বিষয়টি ধীরে ধীরে কম দেখানো হয়েছে। শেষের দিকে মনে হয়েছে, কেদারের এই সমস্যাটি যেন গল্প থেকেই হারিয়ে গেছে।
অ্যানিমেশনের কিছু দৃশ্যও আরও ভালো হতে পারত। সব মিলিয়ে, সিনেমাটিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকলেও অনেকগুলো বিষয় একসঙ্গে রাখার কারণে গল্পের কিছু দিক আরও ভালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল।
উজান গঙ্গোপাধ্যায় গুণী পরিবারের সন্তান, আর সেই গুণের ছাপ তাঁর কাজেও দেখা যায়। এমন একটি বিষয় নিয়ে সিনেমা করার সাহস তিনি দেখিয়েছেন, সেটা সত্যিই ভালো লাগার মতো। কারণ এই ধরনের বিষয় নিয়ে কথা বলা সহজ নয়। তাই একটু অন্য ধরনের সিনেমা করার জন্য SVF-কে ধন্যবাদ দিতেই হয়। নতুন কিছু করতে গেলে ঝুঁকি থাকেই। তবে ভালো লাগার বিষয় হলো, তারা উজানের ভাবনা ও পরিচালনার ওপর বিশ্বাস রেখেছে। একজন অভিভাবক হিসেবে, এই সিনেমা থেকে আমি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা শিখেছি। আমাদের সন্তানের ইচ্ছাকে সম্মান করা উচিত। শুধু ভদ্রতার জন্য তাকে জোর করে কাউকে জড়িয়ে ধরতে বা চুমু দিতে বলা উচিত নয়। কাছের আত্মীয় হলেও নয়। সন্তান যদি “না” বলে, তাহলে তার কথা শুনুন। এমন একটা সম্পর্ক তৈরি করুন, যেখানে সন্তান নিজের কথা বলতে ভয় পাবে না। সে যেন জানে, আপনি তার কথা শুনবেন, তাকে বিশ্বাস করবেন এবং বকবেন না। সন্তানের সঙ্গে সবসময় খোলাখুলি কথা বলুন। তাহলে সেও নিজের মনের কথা আপনার সঙ্গে বলতে পারবে। এভাবেই আমরা সন্তানদের জন্য একটা নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারি।